AB Live News
আলু চাষে শামিমা–আনোয়ারা দেখিয়েছেন নতুন দিগন্ত

খবর এখন: হুগলি জেলার গ্রামবাংলার ভোর মানেই কুয়াশায় মোড়া মাঠ, ভেজা মাটির গন্ধ আর আলু খেতের সারি সারি সবুজ গাছ।বছরের পর বছর ধরে এই দৃশ্য যেন অপরিবর্তিতই রয়ে গিয়েছে। আলু চাষ ছিল এখানকার মানুষের জীবিকা , অভ্যাসের অপর নাম। কিন্তু সেই চেনা ছবির আড়ালেই জমে উঠেছিল নানা সমস্যা। রোগ, অনিশ্চিত ফলন আর ক্রমবর্ধমান খরচ। ঠিক এই বাস্তবতার মধ্যেই জন্ম নেয় বদলের এক নীরব গল্প। যার কেন্দ্রে রয়েছেন শামিমা বেগম ও আনোয়ারা বেগম।
পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলা দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের ‘আলু ভাণ্ডার’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার উর্বর মাটি ও উপযোগী জলবায়ু আলু চাষের জন্য আদর্শ। তবু বাস্তবে বহু কৃষক কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। কারণ চাষের পদ্ধতি বদলালেও সময়ের সঙ্গে তাল মেলেনি। বংশপরম্পরায় চলে আসা পুরনো নিয়মে চাষ করতে গিয়ে ফসল আক্রান্ত হচ্ছিল রোগে। বিশেষ করে ‘ঝলসানো রোগ’ বা ‘লেট ব্লাইটে’। অনেক ক্ষেত্রেই এই রোগের ফলে এক রাতের মধ্যে পুরো খেত নষ্ট হয়ে যেত। এই পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে দেখেছেন শামিমা বেগম ও আনোয়ারা বেগম। ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজ তাঁদের জীবনের অংশ। মাঠে বাবার সঙ্গে কাজ করা, ফসল ওঠার অপেক্ষা, আবার ক্ষতির হতাশা সবই তাঁরা অনুভব করেছেন। বারবার একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছিল, এই সমস্যার কি সত্যিই কোনো স্থায়ী সমাধান নেই! সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাঁরা এগিয়ে যান আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণের দিকে।
প্রশিক্ষণে গিয়ে তাঁদের চোখ খুলে যায়। তাঁরা বুঝতে পারেন, ভালো ফলনের প্রথম শর্তই হলো সঠিক বীজ নির্বাচন। অনেক কৃষকই আগের বছরের আলু বীজ হিসেবে ব্যবহার করেন, যা রোগ বহন করার ঝুঁকি বাড়ায়। শামিমা ও আনোয়ারা তাই সিদ্ধান্ত নেন, রোগমুক্ত ও উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করবেন। তবে শুরুতে এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। একদিকে, উন্নত বীজের দাম তুলনামূলক বেশি। অপরদিকে, আশপাশের অনেকেই এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আনোয়ারা এবং শামিমা জানতেন, দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগই লাভ এনে দেবে।
আলু চাষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ‘ঝলসানো রোগ’। আগে এই রোগ দেখা দিলেই কৃষকরা হুড়োহুড়ি করে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করতেন। তাতে খরচ বাড়ত কিন্তু রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসত না। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শামিমা ও আনোয়ারা শিখেছিলেন, রোগ দমনের চেয়ে রোগ প্রতিরোধ অনেক বেশি কার্যকর। তাঁরা সঠিক দূরত্ব বজায় রেখে চারা রোপণ শুরু করেন। যাতে আলো ও বাতাস চলাচল স্বাভাবিক থাকে। পাশাপাশি মাটির প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ করেন। এই ছোট ছোট পরিবর্তনের প্রভাব ছিল বড়। গাছের স্বাস্থ্য ভালো হতে শুরু করে। রোগের প্রকোপ চোখে পড়ার মতো কমে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, তাঁরা অকারণে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করেন। খুব প্রয়োজন হলে তবেই। তাও সঠিক মাত্রায়। কোথাও কোথাও পরিবেশবান্ধব জৈব পদ্ধতিরও ব্যবহার করেন। এতে জমির উর্বরতা বজায় থাকে এবং উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
ফসল ওঠার সময়ই তাঁদের পরিশ্রমের ফল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হেক্টর প্রতি ফলন আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে যায়। খরচ কম হওয়ায় লাভের অঙ্কও বাড়ে। তবে সংখ্যার চেয়েও বড় ছিল মানসিক পরিবর্তন। অনিশ্চয়তার জায়গায় আসে আত্মবিশ্বাস। ভয়ের জায়গায় আসে পরিকল্পনা। শামিমা ও আনোয়ারার এই সাফল্য গ্রামের চোখ এড়ায়নি। আশপাশের কৃষকরা লক্ষ্য করতে শুরু করেন, তাঁদের ক্ষেতের আলু গাছ অন্যরকম সবুজ। তাতে ফলন বেশি এবং রোগও কম। এ বিষয়ে প্রথমে কৌতূহল জাগে তাঁদের মনে। পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন করেন তাঁরা। যদিও শামিমা এবং আনোয়ারা ধৈর্য ধরে সবাইকে নিজেদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।
আজ তাঁদের দেখাদেখি অনেক কৃষকই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলু চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কেউ অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার কমিয়েছেন। কেউ উন্নত বীজের কথা ভাবছেন। ধীরে ধীরে গ্রামে যেন বদলের হাওয়া বইছে। শামিমা বেগম ও আনোয়ারা বেগমের গল্প আসলে শুধু দু’জন কৃষকের সাফল্যের গল্প নয়। এটি গ্রামবাংলায় আধুনিক কৃষির সম্ভাবনার গল্প। এটি প্রমাণ করে, সঠিক জ্ঞান ও সাহস থাকলে ছোট পরিসর থেকেও বড় পরিবর্তন আনা যায়। হুগলির মাটিতে আজও আলু জন্মায়। কিন্তু সেই আলুর সঙ্গে এখন জড়িয়ে আছে নতুন ভাবনা, নতুন আশা।
নিঃশব্দে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে, শামিমা ও আনোয়ারা বেগম দেখিয়ে দিয়েছেন আধুনিকতা মানে শিকড় ছেঁড়া নয়। বরং শিকড়কে আরও শক্ত করা। তাঁদের আলুর খেতে যে বীজ বোনা হয়েছে, তা শুধু ফসলের নয়। তা হল ভবিষ্যতের আত্মনির্ভরতার আর সচেতন কৃষির পদক্ষেপ
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon Web Desk , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon Web Desk হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

