AB Live News
শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চাবিকাঠি

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ, কথাটি আমরা কমবেশি বলেই থাকি। কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য বা উন্নত মানের পড়াশোনা যথেষ্ট নয়। একটি শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ের ওপরই নির্ভর করে সুন্দর, স্বাভাবিক এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। মানসিকভাবে সুস্থ না হলে তার চিন্তাভাবনা, আচরণ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুর ওপরই প্রভাব পড়ে। আধুনিক সমাজে একে অপরের থেকে নিজেকে এগিয়ে রাখতে পড়াশোনার চাপ, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, পারিবারিক অস্থিরতা ও সামাজিক প্রতিযোগিতার কারণে ছোটদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মানসিক স্বাস্থ্য কী এবং কেন জরুরি
মানসিক স্বাস্থ্য কী তা জানার আগে জানতে হবে আমরা শিশু কাদের বলব?
আঠারো বছরের কম বয়সি যে কোনও ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হবে। ঘরে হোক বা বাইরে, সব শিশুই সমান। একটি শিশু জন্মগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই তার বিভিন্ন অধিকার শুরু হয়। এবং তার অভিভাবক, সমাজ, সরকার এই অধিকারগুলোকেই সুনিশ্চিত করে। এবার আসি মানসিক স্বাস্থ্যের কথায়। শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার দক্ষতা, আত্মসম্মানবোধ, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং অন্যদের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা এই সমস্ত বিষয়টাকেই বলে মানসিক স্বাস্থ্য। ছোটবেলা থেকেই যদি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে উদ্বেগ, হতাশা, আচরণগত সমস্যা বা আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিতে পারে। তাই কী করলে শিশুর ভালো হবে এবং সে কী চায় সেই দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ভূমিকা রাখে তার পরিবার এবং তার বাবা–মা।
ছোটদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে যেসব বিষয়—
বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন প্রাপ্তবয়স্কদের অধিকার আছে তেমনই শিশুদেরও অধিকার আছে। লেখাপড়া করা, খেলাধুলা করা, আমোদপ্রমোদ করা এবং সুন্দর ভাবে বড় হওয়া এগুলি তার নৈতিক অধিকার। এমন ভাবেই সুরক্ষার অধিকার, অংশগ্রহণের অধিকারও আছে। তবে উন্নত বর্তমান সময়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একাধিক বিষয় প্রভাব ফেলছে—
পড়াশোনার চাপ: ভালো ফল করার আশায় পরীক্ষার ভয় এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ অনেক শিশুর মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করে।
পারিবারিক পরিবেশ: বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহে, বিচ্ছেদ বা আর্থিক চাপ শিশুর মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার: অতিরিক্ত মোবাইল, ট্যাব বা ভিডিও গেমে সময় কাটালে শিশুর সামাজিক দক্ষতা কমে যায় এবং একাকিত্ব বাড়ে।
সামাজিক তুলনা: সোশ্যাল মিডিয়া বা সহপাঠীদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার প্রবণতা তাকে ছোট মনে করায় এবং আত্মসম্মানবোধে আঘাত করে।
পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগের অভাব: ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় বাবা-মা শিশুর প্রতি কোনও সময় দেয় না। ফলে কথা মন দিয়ে শোনা বা বলারও সুযোগ পান না।
শিশুর মানসিক সমস্যার লক্ষণ
শিশুরা অনেক সময় নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে না। তাই বড়দেরই কিছু লক্ষণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি—
আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়া বা আক্রমণাত্মক আচরণ, পড়াশোনায় মনোযোগের অভাব, ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন, বারবার ভয় পাওয়া বা কান্নাকাটি করা, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও নিজেকে অক্ষম ভাবা।
এই ধরনের লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে তা মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
বাবা-মায়ের ভূমিকা
শিশু প্রথম শিক্ষা বাবা-মায়ের থেকেই পায়। তাই এই ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খোলামেলা যোগাযোগ: প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শিশুর সঙ্গে কথা বলা, তার দিনের অভিজ্ঞতা শোনা, নিজেদের মতো করে সময় কাটানো খুব জরুরি। এতে অভিভাবকদের সাথে বন্ডিংও ভালো হয়।
ভালো শ্রোতা হওয়া: শিশুর কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে, তার অনুভূতিকে অবহেলা করা যাবে না।
অযথা তুলনা না করা: অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করলে শিশুর আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়।
ভালোবাসা ও নিরাপত্তা: শাসনের পাশাপাশি নিঃশর্ত ভালোবাসা শিশুর মানসিক শক্তি বাড়ায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব
স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুর জীবনের বড় অংশ জুড়ে থাকে। একটি শিশু দিনের বেশিরভাগ সময়টাই তার স্কুলেই কাটায়। তাই এখানেও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন জরুরি। প্রতিনিয়ত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যকলাপ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুসম্পর্ক তাদের আরও উৎসাহ জোগায়।
খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার গুরুত্ব
খেলাধুলা শুধু শরীর ভালো রাখে না বরং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত জরুরি। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশু চাপ ও উদ্বেগ কমাতে পারে, দলগত ভাবে কাজ শেখে, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য দরকার:
যদি শিশুর আচরণগত বা আবেগজনিত সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তবে দ্রুত শিশু মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের সাথে যোগাযোগ করা উচিত। এতে লজ্জার কিছু নেই বরং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে আপনার বাচ্চাও হয়ে উঠবে এক উজ্জ্বল নাগরিক।
শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য কোনও বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক প্রয়োজন। সুস্থ মানসিক বিকাশ ছাড়া শিশুর উন্নত বিকাশ হয় না। পরিবার, স্কুল, সমাজ ও সরকার সবাই মিলে যদি ছোটদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেয়, তবে তারা আত্মবিশ্বাসী, সহানুভূতিশীল ও সুস্থ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে। আজকের যত্নই গড়ে দেবে আগামী দিনের সুস্থ ও সুন্দর সমাজ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon Web Desk , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon Web Desk হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

