AB Live News
সকালে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক, সন্ধ্যায় ফুচকাওয়ালা, সংগ্রামের অন্য নাম এই মানুষটি
সায়নী হাজরা :: দিনের আলোয় তিনি ‘স্যার’। পড়ুয়াদের জীববিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের জটিল বিষয় বোঝান, পড়াশোনার পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেন। আর সন্ধ্যা নামলেই তাঁর পরিচয় বদলে যায়—পরিবারের বহু পুরনো ফুচকার ব্যবসায় দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেন কলকাতার জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। একই মানুষের জীবনে শিক্ষকতা ও ফুচকা বিক্রি, দুই পেশার এমন মেলবন্ধনই তাঁকে আলাদা করে তুলেছে। দক্ষিণ কলকাতার এই বাসিন্দা নিজের পরিচয় বা ফুচকার দোকানের নির্দিষ্ট ঠিকানা প্রকাশ করতে চান না। প্রচারের আলোয় আসার থেকেও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নিজের কাজ এবং পরিবার। জীবনের গল্প বলতে রাজি হলেও ‘ভাইরাল’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধই ছিল তাঁর প্রথম শর্ত।জীবনের শুরুটা অবশ্য এমন ছিল না। জীববিজ্ঞানে স্নাতক এই মানুষটির ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। স্কুলজীবনে এনসিসিতেও যোগ দিয়েছিলেন। পরে সেই স্বপ্ন থেমে যায়। কর্মজীবনে স্থায়ী জায়গা খুঁজতে ২০০৮ সালে কলকাতায় ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু সহজে মেলেনি কাঙ্ক্ষিত চাকরি। অন্যদিকে, বাবা ও ঠাকুরদার হাতে চলা পরিবারের ফুচকার ব্যবসাও তাঁর সামনে ছিল। প্রথম দিকে ফুচকা বিক্রি করতে তাঁর সংকোচ হত। আশপাশের মানুষের কেউ কেউ তাঁকে বলতেন, এই পেশা নাকি তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই নয়। সময়ের সঙ্গে সেই দ্বিধা কাটিয়ে ওঠেন তিনি। ফুচকার ব্যবসাই হয়ে ওঠে পরিবারের আয়ের অন্যতম ভরসা। ধীরে ধীরে এলাকার পরিচিত ফুচকাওয়ালাদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি।এরপর জীবনে আসে আর একটি মোড়। ছেলেরা যে কোচিং সেন্টারে পড়ত, সেখানে কয়েক জন জুনিয়র পড়ুয়ার বিজ্ঞান বিষয়ে সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। সেখান থেকেই শুরু শিক্ষকতার পথ। প্রথমে মাত্র দু’জন পড়ুয়া, পরে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। জীববিজ্ঞানে নিজের পড়াশোনাকে কাজে লাগিয়ে শুরু করেন টিউশন। তাঁর কাছে সেটি শুধু বাড়তি আয়ের পথ ছিল না, নিজের শিক্ষাকে অর্থবহ করে তোলার সুযোগও ছিল। জানা যায়, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুল এবং ডন বস্কোর পড়ুয়ারাও তাঁর কাছে পড়েছে। দিনে পড়ানো ও পড়াশোনা, আর সন্ধ্যায় ফুচকার ব্যবসা, এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রেখেই বছরের পর বছর এগিয়ে চলেছেন তিনি। এই লড়াইয়ে পরিবারের সমর্থনও তাঁর বড় শক্তি। তাঁর দুই ছেলে বাবার পেশা নিয়ে কোনও দিন লজ্জিত হয়নি। বরং বাবার পরিশ্রম এবং সংগ্রাম নিয়েই গর্বিত তাঁরা। প্রায় ১৬ বছর ধরে এই দুই জগতকে পাশাপাশি সামলে চলেছেন তিনি। এখন তাঁর ইচ্ছে আরও বড় পরিসরে পড়ানোর,ভবিষ্যতে একটি কোচিং সেন্টার গড়ে তুলে পূর্ণ সময় ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে চান। পাশাপাশি কর্মীদের সাহায্যে পারিবারিক ফুচকার ব্যবসাটিও চালিয়ে যেতে চান। তাঁর গল্পে তাই পেশার পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে পরিশ্রম, আত্মসম্মান এবং দায়িত্ববোধ। সমাজে কোনও কাজই ছোট নয়—নিজের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে পড়ানো আর পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রেখে ফুচকা বিক্রি, দু’টি কাজকেই নিজের জীবনের অংশ করে নিয়েছেন কলকাতার এই ‘স্যার’। পড়ুয়ার কাছে তিনি শিক্ষক, পাড়ার মানুষের কাছে ফুচকাওয়ালা—আর পরিবারের কাছে নিরলস পরিশ্রমের এক উদাহরণ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

