AB Live News
তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপি বিধায়ক তাপস রায়ের তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক আক্রমণ
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আবহে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংঘাত যখন আরও তীব্র আকার নিচ্ছে, তখন রাজ্য বিধানসভায় বিজেপি বিধায়ক তাপস রায়ের বিস্ফোরক বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এল। সদনের ভেতরে দাঁড়িয়ে তিনি একের পর এক তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়ে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে নিশানা করেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনকে “ধর্মযুদ্ধ” বলে ব্যাখ্যা করে দাবি করেন, এই লড়াই শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রাম। তার বক্তব্য ঘিরে বিধানসভা কক্ষে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং শাসক ও বিরোধী সদস্যদের মধ্যে পাল্টা স্লোগান ও বাকবিতণ্ডার পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
নবনির্বাচিত স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য শুরু করেন তাপস রায়। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা দেশের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এই হাউসের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং সেই ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক সদস্যের দায়িত্ব। তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, “এই পবিত্র হাউসের মর্যাদা ও ঐতিহ্য যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, সেই দায়িত্ব আজ আপনার কাঁধে।” তার দাবি, বিগত কয়েক বছরে বিধানসভার পরিবেশ ও পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে এবং রাজনৈতিক নির্দেশে অনেক সময় হাউস পরিচালিত হয়েছে। সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো প্রয়োজন।
এরপরই নিজের বক্তব্যের রাজনৈতিক সুর আরও চড়া করেন বিজেপি বিধায়ক। তিনি দাবি করেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন ছিল “ধর্মযুদ্ধ”। তার কথায়, “এটি শুধুমাত্র সরকার গঠনের লড়াই নয়। এটি ছিল সত্য ও অসত্যের লড়াই, ন্যায় ও অন্যায়ের লড়াই।” তিনি বলেন, যারা এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে এসেছেন, তাদের অভিনন্দন জানানো উচিত, কারণ তারা বাংলার মানুষকে ভয়মুক্ত করার জন্য লড়াই করেছেন। তার এই মন্তব্য ঘিরে শাসকদলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যদিও তাপস রায় নিজের বক্তব্যে অনড় থাকেন এবং বলেন, বাংলার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন।
সদনের ভেতরে দেশবিরোধী স্লোগান নিয়ে কড়া অবস্থান নেন বিজেপি বিধায়ক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এই বিধানসভায় কোনও রাষ্ট্রবিরোধী বা দেশবিরোধী স্লোগান চলতে পারে না।” তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, এ ধরনের স্লোগান আইন করে বন্ধ করা উচিত। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে অনেক সময় এমন কিছু বক্তব্য ও স্লোগান সামনে আসে যা দেশের ঐক্য ও সংবিধানের পরিপন্থী। তিনি দাবি করেন, বিধানসভা গণতন্ত্রের মন্দির, সেখানে দেশের মর্যাদার বিরুদ্ধে কোনও কথা বলা উচিত নয়।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তাপস রায় দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গ এখন “শাপ মুক্ত, পাপ মুক্ত এবং ভয় মুক্ত” হয়েছে। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি সরাসরি পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আক্রমণ করেন। তার কথায়, দীর্ঘদিন ধরে বাংলার মানুষ ভয়, সন্ত্রাস এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মধ্যে বাস করেছে। এখন মানুষ সেই পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়েছে। বিজেপি বিধায়কের এই মন্তব্যে শাসকদলের তরফে প্রবল আপত্তি ওঠে। তবে তিনি নিজের বক্তব্য চালিয়ে যান এবং বলেন, “বাংলার মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়। তারা ভয় পেয়ে আর ভোট দিতে চায় না।”
এরপরই ভোট-পরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গ তুলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাপস রায়ের অভিযোগ, অতীতে বাংলার রাজনীতিতে রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি হয়েছে। তিনি বলেন, “যদি বিজেপি সরকারে না ফিরত, তবে লাশের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যেত।” তার দাবি, বিরোধী কর্মীদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটত আরও ব্যাপকভাবে। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় ভোটের পরে সন্ত্রাস রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল। তার কথায়, “মানুষ ভোট দেওয়ার পরেও নিরাপদ থাকত না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।”
বিজেপি বিধায়ক আরও দাবি করেন, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বহুবার। তিনি বলেন, “গণতন্ত্রে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করা যায় না। মানুষ তার জবাব ভোটবাক্সে দিয়েছে।” তার বক্তব্যে উঠে আসে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রসঙ্গও। তিনি দাবি করেন, বাংলার মানুষ এখন পরিবর্তন চায় এবং তারা আর সন্ত্রাসের রাজনীতি মেনে নিতে রাজি নয়।
হিংসার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দেন। তাপস রায় বলেন, “যদি আমি কোনও হিংসার সঙ্গে যুক্ত থাকি, তাহলে আমাকে জেলে পাঠিয়ে দিন।” তার এই বক্তব্যে বিধানসভায় মুহূর্তের জন্য উত্তেজনা তৈরি হয়। বিজেপি বিধায়কের দাবি, তিনি রাজনৈতিকভাবে লড়াই করতে বিশ্বাসী, হিংসায় নয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে অতীতে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সত্য লুকিয়ে রাখা যায় না।”
বিধানসভার পবিত্রতা রক্ষার প্রশ্নেও তিনি স্পিকারের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাপস রায় বলেন, “নবান্ন বা রাইটার্সের চিরকুট দিয়ে যেন এই হাউস পরিচালিত না হয়।” তার অভিযোগ, অতীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং বিধানসভার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তিনি স্পিকারকে অনুরোধ করেন, বিধানসভাকে যেন প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক আলোচনার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। তার দাবি, হাউসের হারিয়ে যাওয়া মর্যাদা ও পবিত্রতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব এখন স্পিকারের হাতে।
পুরো বক্তব্য জুড়ে তাপস রায়ের কণ্ঠে ছিল আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বার্তা এবং একই সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে জনসমক্ষে আরও শক্তভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। তার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র রক্ষা এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রসঙ্গ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপি রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে চলেছে, তাপস রায়ের বক্তব্য সেই ইঙ্গিতই বহন করছে।
বক্তব্যের শেষে তিনি “জয় শ্রীরাম” এবং “ভারতমাতার জয়” স্লোগান দেন। সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি সদস্যদের একাংশও স্লোগানে যোগ দেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়াও আসে শাসকদলের দিক থেকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য বিধানসভা কক্ষে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও পরে স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
তাপস রায়ের এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। বিজেপি শিবির তার বক্তব্যকে “বাংলার মানুষের মনের কথা” বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশের অভিযোগ, বিধানসভাকে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করার চেষ্টা করছে বিজেপি। তবে রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে তাপস রায়ের এই ভাষণ যে আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

