Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

ব্রিকস মঞ্চে ইরান-আমিরশাহি বিবাদ, কড়া বার্তা দিল্লির

0 67,894,397

 ভারতে আয়োজিত ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের হাইপ্রোফাইল মঞ্চেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক নজিরবিহীন ও অস্বস্তিকর অধ্যায় রচিত হল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সহযোগিতার লক্ষ্যে আয়োজিত এই শীর্ষ সম্মেলনের মাঝেই প্রকাশ্য বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়লেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) বিদেশমন্ত্রী খলিফা শহিন আল মারার। দুই প্রতিবেশী ও সদস্য রাষ্ট্রের এই আকস্মিক ও তীব্র সংঘাতের জেরে মুহূর্তের মধ্যে সম্মেলন কক্ষে চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা আয়োজক দেশ ভারতের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে আসরে নামতে হয় প্রবীণ ও ঝানু কূটনীতিক তথা রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে। তাঁর অত্যন্ত সক্রিয় মধ্যস্থতা এবং হস্তক্ষেপে দুই দেশের ক্ষুব্ধ বিদেশমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত শান্ত হন এবং একটি বড়সড় কূটনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়। তবে এই প্রকাশ্য সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়ে ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধিদের সামনে রেখেই অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে নয়াদিল্লি।

পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া প্রবল সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সংঘাতের ছায়াই মূলত ব্রিকসের এই মঞ্চকে তপ্ত করে তুলেছে। ঘটনার প্রেক্ষাপট ঘাঁটলে দেখা যায়, আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে আক্রমণ চালানোর পর থেকেই সমগ্র পশ্চিম এশিয়া জুড়ে এক চরম যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিশোধ এবং প্রতিরোধ হিসেবে তেহরানের পক্ষ থেকে ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলি লক্ষ্য করে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হতে থাকে। তেহরানের এই ধারাবাহিক পালটা সামরিক অভিযানের আঁচ এসে পড়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ওপরও। আমিরশাহির মাটিতে একাধিকবার এই ধরণের হামলার ঘটনা ঘটায় আবুধাবি ও তেহরানের পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। দীর্ঘদিনের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও সামরিক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশই এদিন ভারতের মাটিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনের গোলটেবিল বৈঠকে আছড়ে পড়ে। দুই দেশের বিদেশমন্ত্রীর এই প্রকাশ্য বিরোধিতার জেরে সম্মেলন থেকে পশ্চিম এশিয়ার সঙ্কট বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে কোনও সম্মিলিত সুসংগঠিত বার্তা দেওয়া ব্রিকস জোটের পক্ষে কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

ব্রিকসের এই উদ্বায়ী পরিস্থিতিতে আসরে নেমে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর অত্যন্ত চাণক্য কূটনীতির পরিচয় দেন। তিনি বিবাদমান দুই দেশ অর্থাৎ ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধিকে দুই পাশে বসিয়েই আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালীর সঙ্কট প্রসঙ্গে দিল্লির আপসহীন ও কঠোর অবস্থানের কথা বিশ্বমঞ্চে ঘোষণা করেন। সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট দেশের নাম মুখে না আনলেও ভারতের বিদেশমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার বা সামরিক সঙ্ঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ অবরুদ্ধ করার চেষ্টা ভারত কোনওভাবেই বরদাস্ত করবে না। জয়শঙ্কর তাঁর ভাষণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি, বিশেষত হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের সার্বিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক চলাচলের স্বাধীনতা এবং বিশ্ব বাজারে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ বজায় রাখার বিষয়টি নিয়ে নয়াদিল্লি অত্যন্ত গভীর ভাবে উদ্বিগ।” ব্রিকসের নতুন ও পুরোনো সমস্ত সদস্য রাষ্ট্রকে এই ‘অভূতপূর্ব ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা’র সম্মিলিত মোকাবিলার জন্য কোনওরকম ভাবাবেগে না ভেসে বাস্তবসম্মত এবং কার্যকরী উপায় অনুসন্ধানের জন্য জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

ভারতের বিদেশমন্ত্রীর এই কঠোর বার্তার নেপথ্যে একটি অত্যন্ত তাৎক্ষণিক এবং বড় কারণও রয়েছে। ব্রিকস সম্মেলন শুরু হওয়ার ঠিক দুই দিন আগে, বুধবার হরমুজ প্রণালীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় ওমান উপকূলে ভারতীয় পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। সেই মারাত্মক হামলায় জাহাজটি সমুদ্রের বুকে সম্পূর্ণ ডুবে গেলেও ওমান কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় জাহাজে থাকা সমস্ত ভারতীয় ক্রু ও কর্মীদের অলৌকিকভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনার পর বৃহস্পতিবারই ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বিবৃতি জারি করে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল। এর ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের মাটিতে ব্রিকসের মতো এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি বার্তা দেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। জয়শঙ্কর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরসহ সমস্ত আন্তর্জাতিক জলপথগুলিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলির নিরাপদ ও বাধাহীন যাতায়াত সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। কোনও একটি অঞ্চলের সংকটের প্রভাব যেন বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর না পড়ে।”

একই সঙ্গে সুকৌশলে বিশ্বমঞ্চে ভারতের আদর্শগত অবস্থান স্পষ্ট করে জয়শঙ্কর মনে করিয়ে দেন যে, ‘‘সার্বভৌমত্ব এবং ভূখণ্ডের অখণ্ডতার প্রতি পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনই যে কোনও আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। যুদ্ধ বা হামলা কখনওই কোনও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না, আলোচনা এবং কূটনীতিই হল সমস্ত আন্তর্জাতিক সংঘাত থামানোর একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।’’ পশ্চিম এশিয়ার এই নজিরবিহীন উত্তেজনা প্রশমন করতে এবং ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ভারত সবসময়ই গঠনমূলক অবদান রাখতে প্রস্তুত এবং যে কোনও ধরণের ইতিবাচক বা শুভ কূটনৈতিক উদ্যোগকে নয়াদিল্লি সম্পূর্ণ সমর্থন জানাবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

উল্লেখ্য, ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া, চিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত ব্রিকসের এই প্রাথমিক জোটে ২০২৪ সালেই নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি ইন্দোনেশিয়াও এই আন্তর্জাতিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়। এ বছর এই বিশাল ও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক জোটের শীর্ষ সম্মেলনের গুরুদায়িত্ব বা প্রেসিডেন্সি রয়েছে ভারতের কাঁধে। কিন্তু নতুন দুই সদস্য রাষ্ট্র ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যকার চরম বৈরিতা যেভাবে প্রথম সারির আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রকাশ পেয়ে গেল, তা আগামী দিনে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বিস্তর আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper