AB Live News
তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক বৈশাখী
রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের ‘পৈশাচিক চেহারা’ এবং ক্ষমতার দম্ভ নিয়ে এবার নজিরবিহীন ও ভয়ঙ্কর বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের কিছুকাল আগে সশরীরে ঘাসফুল শিবিরে যোগ দিলেও বিগত দিনে কার্যত ‘নিষ্ক্রিয়’ ভূমিকাতেই দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এবার সেই দলেরই প্রথম সারির নেতাদের তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তিনি দাবি করলেন, অতীতে তাঁর শিশুকন্যাকে নৃশংসভাবে খুন করার চক্রান্ত করা হয়েছিল এবং তাঁর নিজের মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারার নীল নকশাও তৈরি হয়েছিল। আর এই হাড়হিম করা ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে ছিলেন স্বয়ং তৃণমূলেরই অত্যন্ত প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিবর্গ। একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিগত বছরের এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনে তিনি শাসক দলের একাংশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। একই সঙ্গে কলকাতা পুরসভার মেয়র তথা রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমসহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতাকে একহাত নিয়ে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, দলের নেতাদের লাগামহীন অহংকার এবং ক্ষমতার দম্ভই আজ বিভিন্ন নির্বাচনে তৃণমূলের বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিজের এবং মেয়ের জীবন নিয়ে ঠিক কী ধরনের ভয়ঙ্কর খেলা খেলা হয়েছিল, সাক্ষাৎকারে সেই স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে শিউরে ওঠেন বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের এক রাতে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি রাতের খাবার খেতে একটি রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন। ঠিক সেই সময়েই আচমকা তাঁর মুঠোফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে বেশ কয়েকটি উড়ো বার্তা বা মেসেজ আসতে শুরু করে। সেই সমস্ত মেসেজে পরিষ্কার ভাষায় লেখা ছিল যে, বৈশাখী এবং তাঁর নাবালিকা কন্যার জীবনের ওপর মস্ত বড় ঝুঁকি রয়েছে। অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে তিনি যখন সেই অপরিচিত নম্বরে পালটা মেসেজ পাঠিয়ে প্রেরকের পরিচয় জানতে চান, তখন ওপার থেকে যে উত্তর আসে তা শুনে তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। ওপার থেকে জানানো হয়, মেসেজ প্রেরণকারী ব্যক্তি স্বয়ং বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক মহিলা নিরাপত্তা রক্ষীর স্বামী। ওই ব্যক্তি সরাসরি দাবি করেন, তাঁর স্ত্রীকে মোটা অঙ্কের টাকার টোপ দেওয়া হয়েছে যাতে সুযোগ বুঝে সে বৈশাখীর মেয়েকে খুন করে এবং খোদ বৈশাখীর মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মেরে তাঁর রূপ ও জীবন চিরতরে নষ্ট করে দেয়। শুধু তাই নয়, তৎকালীন মন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে একটি ভুয়ো ধর্ষণের মামলা দায়ের করার জন্যও ওই চক্রটি বিপুল পরিমাণ টাকা ছড়িয়েছিল বলে অভিযোগ করেন বৈশাখী।
এই রোমহর্ষক ও পৈশাচিক চক্রান্তের কথা জানতে পারার পর স্বাভাবিকভাবেই তীব্র আতঙ্ক ও আশঙ্কায় গ্রাস করেছিল বৈশাখীকে। মেয়ের জীবন বাঁচাতে তিনি তড়িঘড়ি তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনারের দ্বারস্থ হন এবং থানায় একটি লিখিত এফআইআর (FIR) দায়ের করেন। বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি অনুযায়ী, পুলিশের নির্দেশে ১৪ আগস্ট ওই অভিযুক্ত যুবককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বৈশাখীদের নিজেদের বাসভবনেই ডেকে পাঠানো হয়েছিল। সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী আইপিএস (IPS) অফিসার। সেই উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্তার সামনেই ওই যুবক নিজের অপরাধ এবং চক্রান্তের কথা কবুল করে। সে বিস্তারিতভাবে জানায়, ঠিক কত টাকা সুপারি দেওয়া হয়েছিল এবং ঠিক কতগুলি কিস্তিতে বা ইনস্টলমেন্টে সেই টাকা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। বৈশাখীর চরম ক্ষোভ, এত বড় একটি অপরাধের চক্রান্তের লাইভ স্বীকারোক্তি এবং সমস্ত তথ্যপ্রমাণ চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন কোনও কার্যকর পদক্ষেপ করেনি, এমনকি মূল ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করতে বাকিদের জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করা হয়নি।
পুলিশের এই চরম নিষ্ক্রিয়তা এবং উদাসীনতা দেখে নিরুপায় হয়ে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ স্তরে, অর্থাৎ জাতীয় মহিলা কমিশনের দ্বারস্থ হন। সেখানে তিনি গোটা বিষয়টি সবিস্তারে জানিয়ে সুবিচারের আর্জি জানান। কিন্তু অভিযোগ, তৎকালীন এক আইপিএস অফিসার রাজ্য রাজনীতি ও প্রশাসনের প্রভাবশালী চক্রকে বাঁচাতে গোটা ঘটনাটিকে স্রেফ ‘ফিগমেন্ট অফ ইমাজিনেশন’ বা ‘কাল্পনিক গল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়ে জাতীয় মহিলা কমিশনে একটি মনগড়া রিপোর্ট জমা দেন। ফলে ধামাচাপা পড়ে যায় গোটা তদন্ত প্রক্রিয়া। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়েছেন যে, তিনি সহজে দমে যাওয়ার পাত্রী নন। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বেশ কিছু আইপিএস অফিসারের কর্মপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এবং তাঁদের সাসপেন্ড হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, সেই সময়কার বয়ানের সম্পূর্ণ অডিও ও ভিডিও কপি তাঁর কাছে সুরক্ষিত রয়েছে। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সেই সমস্ত ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ তিনি আবারও নতুন করে জাতীয় মহিলা কমিশনের কাছে জমা দিতে চলেছেন যাতে প্রকৃত অপরাধীদের মুখোশ খুলে যায়।
শাসক দলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় দলের নেতাদের অহংকার ও ক্ষমতার দম্ভকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ক্ষমতার দম্ভের কারণেই আজ সাধারণ মানুষ শাসক দলকে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে এবং নেতাদের এই চরম পরিণতি দেখতে হচ্ছে। দলনেত্রীর চারপাশের বলয়কে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, দলের মধ্যে কি আর কোনও দুর্নীতিপরায়ণ নেতা নেই? দলে কেবল একজন পার্থ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন না। তাঁর কথায়, “দলের মধ্যে কি আর কোনও পার্থ নেই? অনেক চট্টোপাধ্যায়, অনেক মুখার্জি, অনেক বিশ্বাস, অনেক হাকিমরা রয়েছেন। তাঁদের পৈশাচিক চেহারা মানুষ খুব ভালো করেই চেনেন।” এই সমস্ত নেতারা ক্ষমতার অলিন্দে বসে সাধারণ মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করতেন না এবং নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতেন বলে তোপ দাগেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে কলকাতা পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে সরাসরি নিশানা করে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “যে ফিরহাদ হাকিম একদিন ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে আমাকে প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে কলেজ থেকে ‘উখাড়কে ফেক দেঙ্গে’ অর্থাৎ উপড়ে ফেলে দেব, আজ সময় বদলেছে। আজ তাঁর নিজের দলকেই মানুষ পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় মাটি থেকে উপড়ে ফেলে দিয়েছে।” রাজনীতির অলিন্দে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বৈশাখী বিশ্বাস করেন যে, এতদিন ধরে একপ্রকার জোরপূর্বক প্রভাব খাটিয়ে তাঁর নিজস্ব স্বাধীন সত্তা ও পরিচয়টাই আস্তে আস্তে হরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। দীর্ঘদিনের সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ এবং ষড়যন্ত্রের জাল কেটে তিনি এখন সম্পূর্ণ মুক্ত নিঃশ্বাস নিতে পারছেন বলে অত্যন্ত আশাবাদী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারের পর স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল পড়ে গিয়েছে এবং বিরোধী দলগুলিও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক দলকে কোণঠাসা করতে কোমর বেঁধে ময়দানে নামছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

