Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

মালদহে সীমান্ত ঘিরে ফেলার ঐতিহাসিক উদ্যোগ

0 598,321,721

 ভারত ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভূখণ্ডকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নিশ্ছিদ্র করতে অবশেষে এক ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করল প্রশাসন। মালদহ জেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া বসানোর জন্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হল জমি অধিগ্রহণের মেগা প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিনের টালবাহানা এবং জটিলতা কাটিয়ে এই সীমান্ত সুরক্ষার কাজ গতি পাওয়ায় সীমান্তপাড়ের গ্রামগুলিতে এখন খুশির হাওয়া। বছরের পর বছর ধরে যে উন্মুক্ত সীমান্ত অনুপ্রবেশ, পাচার এবং নিরাপত্তার অভাবের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা এবার চিরতরে বন্ধ হতে চলেছে। মালদহের জেলা প্রশাসন এবং রাজ্য সরকারের এই যৌথ সমন্বয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা যেমন এক নতুন মাত্রায় পৌঁছবে, তেমনই আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে।

জেলা প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, মালদহ জেলায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭২ কিলোমিটার। এই বিশাল ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার এলাকা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বা বেড়াহীন অবস্থায় পড়ে ছিল। কাঁটাতারের বেড়া না থাকার কারণে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত অপরাধমূলক কাজকর্মের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে জেলার হবিবপুর এবং বামনগোলা ব্লকেই উন্মুক্ত বা খোলা সীমান্তের পরিমাণ সবথেকে বেশি। এ ছাড়াও মালদহের ইংরেজবাজার এবং কালিয়াচক-তিন নম্বর ব্লকের অধীনস্থ বেশ কয়েক কিলোমিটার এলাকাও উন্মুক্ত সীমান্তে ঘেরা। ভৌগোলিক জটিলতার কারণে এখানে আরও প্রায় তিন কিলোমিটার এমন এলাকা রয়েছে যা নদী ও জলপথ বেষ্টিত, ফলে সেখানে নজরদারি চালানো সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্ত শূন্যস্থান ও ফাঁকফোকর বন্ধ করতে এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করার একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

এই বিশাল উন্নয়নমূলক কর্মযজ্ঞের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তীব্র সদিচ্ছা। রাজ্যে নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর এবং মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার পরেই এই অমীমাংসিত সীমান্ত জট খোলার বিষয়ে কড়া নির্দেশ জারি করেন। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে যে কোনও মূল্যে জমি অধিগ্রহণের সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই অনমনীয় মনোভাব এবং সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পরেই গোটা মালদহ জেলা জুড়ে চাঞ্চল্য এবং স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মালদহের হবিবপুর ব্লকের সীমান্তপাড়ে অবস্থিত জোতকুবের গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার আলো দেখা দিয়েছে। এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই পেশায় কৃষিজীবী। তাঁদের খেতখামার ও চাষের জমি সীমান্তের একেবারের কোল ঘেঁষে অবস্থিত। দীর্ঘ দিন ধরে সীমান্ত পারের নানা অপরাধ ও অশান্তির আশঙ্কায় তাঁরা সিঁটিয়ে থাকতেন। নতুন সরকারের কড়া এবং ইতিবাচক বার্তা গ্রামে পৌঁছনোর পর থেকেই সেখানে এক উৎসবমুখর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং সানন্দে নিজেদের চাষের জমি দেশের স্বার্থে দিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়েছেন।

কৃষক ও সাধারণ গ্রামবাসীদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। তাঁরা সমস্বরে জানিয়েছেন, নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক সুরক্ষাকে জোরদার করতে তাঁরা যে কোনও ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি আছেন। জমি চলে গেলে তাঁদের জীবিকায় কিছুটা টান পড়লেও, তাঁরা চান সীমান্তে কাঁটাতারের স্থায়ী বেড়া তৈরি হোক। তবে, কৃষকদের একাংশের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও প্রশাসনের কাছে পেশ করা হয়েছে। কৃষকদের মতে, কাঁটাতারের বেড়াটি যদি ভারত ও বাংলাদেশের একেবারে ‘জিরো পয়েন্ট’ বা আন্তর্জাতিক সীমারেখা বরাবর নির্মাণ করা হয়, তবে ভারতের ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা অনেক কৃষিজমি বেঁচে যাবে এবং কৃষকদের বেড়ার ওপারে গিয়ে চাষ করার বিড়ম্বনা পোহাতে হবে না। কারণ, সাধারণত বেড়া জিরো পয়েন্ট থেকে কিছুটা ভেতরে হওয়ার কারণে ভারতের বহু আবাদি জমি বেড়ার ওপারে চলে যায়, যা দেশের কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কারণ হয়। এই বিষয়ে কৃষকেরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তবে এই খুঁটিনাটি দাবিদাওয়া সত্ত্বেও, সীমান্তের প্রতিটি মানুষ একযোগে চাইছেন যে আর কোনও দেরি না করে পুরো সীমান্ত এলাকাকে অবিলম্বে লোহার কাঁটাতারে মুড়ে ফেলা হোক।

প্রশাসনিক ও আর্থিক দিক থেকেও এই প্রকল্পের কাজ অবিশ্বাস্য গতিতে এগোচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, উন্মুক্ত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য যে মোট ২৬০ একর জমির প্রয়োজন, তার মধ্যে ইতিমধ্যে ১০ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ আইনিভাবে সম্পন্ন করা হয়ে গিয়েছে। বাকি ২৫০ একর জমির ক্ষেত্রে যাতে কোনও প্রকার জটিলতা বা সময় নষ্ট না হয়, তার জন্য প্রশাসন অত্যন্ত নিখুঁত ও আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় জমি পরিমাপের কাজ, জমির মালিকানা যাচাই, মূল্য নির্ধারণ এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য জেলাশাসকের দফতর থেকে একাধিক বিশেষ টাস্ক ফোর্স বা টিম গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত একটি উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে এই টিমগুলির রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা সরাসরি মহকুমা শাসক এবং জেলাশাসকের নজরদারিতে কাজ করবে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এই প্রকল্পের জন্য অর্থের কোনও অভাব হবে না। ইতিমধ্যেই জমি অধিগ্রহণ এবং প্রাথমিক পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় পূর্ত সড়ক বিভাগের তরফ থেকে মালদহ জেলা প্রশাসনের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ও স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে টাকার অভাবে কাজ থমকে থাকার কোনও আশঙ্কাই আর নেই। মালদহের যে সমস্ত এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করতে হবে, তার সিংহভাগ অংশই পড়ছে হবিবপুর ব্লকের অধীনে। এই ব্লকে ২৯.৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য মোট ২৩১ একর জমি প্রয়োজন হচ্ছে। যার মধ্যে ১০ একর ইতিমধ্যেই সরকারের নিয়ন্ত্রণে এসে গিয়েছে। বাকি ২২১ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ আগামী দেড় মাসের মধ্যে অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া ৪৫ দিনের ডেডলাইনের মধ্যেই শেষ করতে বদ্ধপরিকর জেলা প্রশাসন।

অন্য দিকে, কালিয়াচক-তিন নম্বর ব্লকের অধীনস্থ ২.২৫ কিলোমিটার উন্মুক্ত সীমান্তেও কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করতে অতিরিক্ত ১৯.৩ একর জমির প্রয়োজন হচ্ছে। সেই জমিও দ্রুত চিহ্নিত করে মালিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। জেলা প্রশাসনের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, এই কাঁটাতারের বেড়া শুধু অনুপ্রবেশ বা চোরাচালানই বন্ধ করবে না, বরং ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করবে। সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামগুলিতে এর ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যার এমন দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান হতে চলায় গোটা মালদহ জেলা জুড়ে এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper