AB Live News
নরেন্দ্রপুরে আইসি বদল ঘিরে ধুন্ধুমার, এবার ওসির বিরুদ্ধে ‘বিজেপি-ঘনিষ্ঠতা’র অভিযোগে সরব তৃণমূল
ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই বাংলার নির্বাচনী রণক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিশন বনাম রাজ্যের শাসকদলের সংঘাত তুঙ্গে উঠেছে। তবে এবার সেই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল দক্ষিণ ২৪ পরগনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নরেন্দ্রপুর থানা। সেখানকার আইসি বদলকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে যেমন অভিযোগের পাহাড় জমছে, তেমনই রাজপথে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর। গত কয়েক দিনে এই থানার পুলিশি রদবদল নিয়ে যা নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে, তা ছাপিয়ে গিয়েছে অনেক বড় রাজনৈতিক ঘটনাকেও। কয়েক দিন আগেই গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে নরেন্দ্রপুরের তৎকালীন ওসি সুরিন্দর সিংয়ের বিরুদ্ধে চরম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। বিজেপির দাবি ছিল, সুরিন্দর সিং শাসকদলের অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছেন এবং তাঁর অধীনে এলাকায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সেই অভিযোগকে মান্যতা দিয়েই তড়িঘড়ি সুরিন্দর সিংকে পদ থেকে সরিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। তাঁর জায়গায় নতুন আইসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রসেনজিৎ বিষ্ণুকে। কিন্তু এই নিয়োগ ঘিরেই এবার পাল্টা রণংদেহি মেজাজে অবতীর্ণ হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।
তৃণমূলের দাবি, এক পক্ষকে খুশি করতে গিয়ে কমিশন এমন একজনকে দায়িত্ব দিয়েছে যাঁর সঙ্গে বিজেপির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। এই মর্মে নির্বাচন কমিশনের দরবারে সরব হয়েছেন তৃণমূলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য তথা বর্ষীয়ান সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন। খোদ ডেরেক ও’ব্রায়েন কমিশনকে একটি কড়া চিঠি লিখে নতুন আইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তৃণমূলের ওই চিঠিতে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এক দাবি করা হয়েছে। ডেরেক ও’ব্রায়েন জানিয়েছেন, নরেন্দ্রপুর থানার বর্তমান আইসি প্রসেনজিৎ বিষ্ণু এবং সোনারপুর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী তথা প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিক দেবাশিস ধর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শাসকদলের দাবি অনুযায়ী, প্রসেনজিৎ এবং দেবাশিস একই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন এবং তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক সখ্য রয়েছে। ডেরেক তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এবং ব্যক্তিগত জমায়েতে এই দুজনকে প্রায়শই একসঙ্গে দেখা যায়। এমতাবস্থায়, এক বন্ধুর নির্বাচনী কেন্দ্রে অন্য বন্ধু যদি থানার সর্বোচ্চ পদে আসীন থাকেন, তবে সাধারণ ভোটাররা কতটা নিরাপত্তা পাবেন এবং ভোটপ্রক্রিয়া কতটা কলুষমুক্ত থাকবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে রয়েছে।
বিতর্কের এই আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছেন সোনারপুর উত্তরের তৃণমূল প্রার্থী ফিরদৌসী বেগম। তিনি সরাসরি কমিশনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, যদি আগের ওসিকে সরাতেই হতো, তবে কেন এমন একজনকে আনা হলো যাঁর অতীত রেকর্ড এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়? ফিরদৌসী বেগমের স্পষ্ট অভিযোগ, “আমরা চেয়েছিলাম একজন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অফিসার। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনও কারণ না দেখিয়েই আগের আধিকারিককে সরাল এবং বিজেপির পছন্দের লোককে বসিয়ে দিল। এটা কি গণতন্ত্রের জন্য শুভলক্ষণ? আমরা মনে করছি এর ফলে ভোটের ময়দানে বিজেপি বাড়তি সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করবে।” তৃণমূলের অন্দরে এই বদলিকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ এবং ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের সাফ কথা, কমিশনকে ব্যবহার করে বিজেপি নিজেদের আখের গোছাতে চাইছে।
তবে এই সমস্ত অভিযোগকে বিন্দুমাত্র আমল দিতে নারাজ গেরুয়া শিবির। খোদ বিজেপি প্রার্থী দেবাশিস ধর এই প্রসঙ্গে পালটা যুক্তি সাজিয়েছেন। প্রাক্তন এই দুঁদে আইপিএস অফিসার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি নিজে দীর্ঘদিন পুলিশ বিভাগে কর্মরত ছিলেন, তাই কর্মজীবনে অনেকের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় বা সুসম্পর্ক থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। দেবাশিস ধরের কথায়, “আগের ওসির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিস্তর অভিযোগ ছিল, তিনি দলদাসের মতো আচরণ করছিলেন বলেই তাঁকে সরানো হয়েছে। আর প্রসেনজিৎ বিষ্ণুর নিয়োগের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনও সম্পর্ক নেই। এটা কমিশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তৃণমূল আসলে হার নিশ্চিত জেনে এখন অফিসারদের ওপর দোষারোপ করে অজুহাত খুঁজছে।” বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, তৃণমূল ভয় পেয়েছে বলেই এখন স্কুলের সহপাঠী খোঁজার মতো ঠুনকো যুক্তি দিয়ে কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
নরেন্দ্রপুরের এই আইসি-যুদ্ধ এখন আর কেবল একটি থানার বদলি সংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে ডেরেক ও’ব্রায়েনের পাঠানো চিঠি এবং প্রসেনজিৎ বিষ্ণুর ‘বিজেপি-ঘনিষ্ঠতা’র প্রমাণ দাখিলের দাবি, অন্যদিকে বিজেপির ‘স্বাভাবিক পরিচয়’র তত্ত্ব— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে সরগরম সোনারপুরের রাজনৈতিক আবহাওয়া। এখন দেখার, তৃণমূলের এই নালিশের পর কমিশন কি পুনরায় নরেন্দ্রপুরের দায়িত্বে রদবদল ঘটাবে, নাকি প্রসেনজিৎ বিষ্ণুর ওপরেই আস্থা রাখবে। ২০ মে-র ভোটের আগে এই আইসি বদল বিতর্ক যে নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে। সব মিলিয়ে, নরেন্দ্রপুর থানা এখন কার্যত এক রাজনৈতিক কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ মাপা হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

