AB Live News
দুর্ঘটনায় রাজপথে মৃত্যুমিছিল: নজরদারির অভাব ও আইনি দীর্ঘসূত্রতার ছবি দেশজুড়ে
ভারতে ক্রমবর্ধমান ‘হিট-অ্যান্ড-রান’ বা ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ধারাবাহিক চিত্র উঠে আসছে। সাধারণ মানুষ ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে মূলত চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা বা তাৎক্ষণিক নৈতিক স্খলনকে দায়ী করলেও, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য এক গভীর কাঠামোগত সংকটের দিকে আঙুল তুলছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো এবং সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হিট-অ্যান্ড-রান মৃত্যুর সংখ্যা গত এক দশকে প্রায় ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রের পেশ করা তথ্যেই উঠে এসেছে, ২০১৩ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ১৮,৭০২, তা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১,২০৯-এ। মোট পথ দুর্ঘটনার মধ্যে এই ধরনের হিট-অ্যান্ড-রান দুর্ঘটনার হার ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ শতাংশে। বিশেষ করে অতিমারি পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যেই হিট-অ্যান্ড-রান মৃত্যু বেড়েছে ১৮ শতাংশ। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থান— বিজেপি শাসিত এই চারটি রাজ্যেই দেশের মোট হিট-অ্যান্ড-রান মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঘটে থাকে। তবে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের মতো জনঘনত্বপূর্ণ এলাকায় গাড়ির সংখ্যার তুলনায় দুর্ঘটনার হার ও ঝুঁকি অনেক বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, এই দুর্ঘটনার শিকার মূলত সমাজের পিছিয়ে থাকা বা অসুরক্ষিত অংশ। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, পথ দুর্ঘটনায় মৃতদের ৪৪.৫ শতাংশ ছিলেন দু’চাকার আরোহী এবং ১৯.৫ শতাংশ ছিলেন পথচারী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে অর্ধেকের বেশি মৃত্যু ঘটে এই ধরনের সাধারণ মানুষের। ভৌগোলিক দিক থেকে ৬৮ শতাংশ মৃত্যু ঘটে গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে ট্রাফিক নজরদারি, পর্যাপ্ত আলো এবং জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার অভাব প্রকট। রাত ৯টা থেকে মধ্যরাতের মধ্যে দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি, কারণ অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অপরাধীদের শনাক্ত হওয়ার ভয় কম থাকে এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাব বেড়ে যায়। সমস্যার মূলে রয়েছে দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। ২০২২ সালে প্রায় ৪৭,৮০০টি হিট-অ্যান্ড-রান মামলা নথিভুক্ত হলেও সাজার হার অত্যন্ত হতাশাজনক। গাফিলতির কারণে মৃত্যুর মামলায় সাজার হার ৫০ শতাংশের নিচে, আর ৯০ শতাংশের বেশি মামলা বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকে। যদিও ২০১৯ সালের মোটর ভেহিক্যালস সংশোধনী আইন এবং ২০২৪ সালের ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় শাস্তির বিধান কঠোর করা হয়েছে, কিন্তু ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম থাকলে কঠোর শাস্তিও অপরাধীদের মনে ভয় ধরাতে পারছে না। নজরদারি ব্যবস্থার অভাব এবং বিমা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে চালকরা পালানোর সিদ্ধান্তকে ‘যৌক্তিক’ বলে মনে করে। তবে কেরল বা তামিলনাড়ুর মতো কিছু রাজ্য এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিশা দেখাচ্ছে। কেরলে দুর্ঘটনার হার বেশি হলেও মৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক কম, যার মূল কারণ দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর সঠিক ব্যবহার। তামিলনাড়ু ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে দুর্ঘটনার প্রবণতা বিশ্লেষণ করছে এবং গুজরাট আইনগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পরিকাঠামো তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ স্বাভাবিক হলেও শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে শাস্তির মেয়াদ বাড়ানোই সমাধান নয়। দ্রুত বিচার ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ও অটোমেটেড চালান, উন্নত সড়ক পরিকল্পনা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাই এই প্রাণঘাতী ধারা বন্ধের একমাত্র পথ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

