AB Live News
অভিষেকের চিঠিতে ‘গলদ’, থমকে গেল বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনোত্তর বাংলায় এখন এক নজিরবিহীন ও অদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর এ রাজ্যের শাসনক্ষমতার হাতবদল হয়েছে এবং বিধানসভার অলিন্দে শাসক ও বিরোধী শিবিরের স্থান পরিবর্তন ঘটেছে। এই নতুন রাজনৈতিক আবহে বিধানসভার অন্দরে বিরোধী দলনেতার ঘরে কে বসবেন এবং কার নামে সেই কক্ষের নামফলকটি চূড়ান্ত হবে, তা নিয়ে এক চরম আইনি ও প্রশাসনিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের পক্ষ থেকে প্রবীণ তথা বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রস্তাব করে অনেক আগেই স্পিকারের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের ধারণা ছিল, প্রথা মেনে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গেই এই পদের মান্যতা মিলে যাবে। কিন্তু খোদ বিধানসভার স্পিকারের আইনি আপত্তিতেই আপাতত লালফিতের ফাসে সম্পূর্ণ ঝুলে রইল সেই বহুপ্রতীক্ষিত সাংবিধানিক স্বীকৃতি। বিধানসভা সচিবালয় সূত্রে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকরভাবে দাবি করা হয়েছে যে, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো সেই চিঠিতেই রয়ে গিয়েছে এক মস্ত বড় আইনি ও টেকনিক্যাল ‘গলদ’। আর সেই কারণেই নিয়মকানুনের চূড়ান্ত তোয়াক্কা করে এখনই শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিক মান্যতা দিতে পারছেন না নবনির্বাচিত স্পিকার। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
বিধানসভা সচিবালয়ের সর্বোচ্চ মহল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের পাঠানো ওই চিঠিতে ঠিক কী কী খামতি ছিল, তা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছেন খোদ বিধানসভার সচিব। তিনি জানিয়েছেন যে, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মাননীয় অধ্যক্ষ বা স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন, সেখানে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, সর্বসম্মতিক্রমে বিধানসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করা হয়েছে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে। এর পাশাপাশি সেই একই চিঠিতে সহকারী দলনেতা হিসেবে অসীমা পাত্র ও নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিধানসভার মুখ্য সচেতক বা চিফ হুইপ (Chief Whip) হিসেবে ফিরহাদ হাকিমের নামও চূড়ান্ত সুপারিশ হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সমস্যাটি পেকেছে সম্পূর্ণ অন্য একটি প্রযুক্তিগত ও আইনি জায়গায়। সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদীয় নিয়ম মেনে এই ধরনের একটি বড় সিদ্ধান্তের চিঠির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলীয় বৈঠকের কোনও আনুষ্ঠানিক রেজোলিউশন কপি বা সভার কার্যবিবরণীর খসড়া (মিনিটস) সংযুক্ত করে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, দলের পরিষদীয় দলের বৈঠকে কতজন নির্বাচিত সদস্য উপস্থিত ছিলেন এবং কতজন এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সায় দিয়ে স্বাক্ষর করেছেন, তার কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা খতিয়ান সেই চিঠিতে অনুপস্থিত ছিল। এমনকী চিঠিতে একটি দলীয় বৈঠকের কথা আবছাভাবে উল্লেখ করা হলেও, সেই ঐতিহাসিক বৈঠকটি ঠিক কবে, কোন তারিখে এবং কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল—তারও কোনও স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না।
কবে বৈঠক হল, কারা সেই বৈঠকে নিজের সম্মতি বা সায় দিলেন—এই সমস্ত প্রাথমিক ও জরুরি তথ্য চিঠিতে স্পষ্ট না হওয়ায় বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু এই চিঠির ভিত্তিতে কোনওপ্রকার চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। সংসদীয় রীতিনীতি অনুযায়ী, অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে এত বড় একটি সাংবিধানিক পদের স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে করছে আইনসভা সচিবালয়। আর সেই কারণেই বিধানসভা সচিবালয়ের তরফে অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে পরের দিনই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাল্টা একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেই চিঠিতে স্পিকারের দপ্তরের নির্দেশ মেনে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পূর্বোক্ত সভার পুঙ্খানুপুঙ্খ রেজোলিউশন কপি, মিনিটস এবং কতজন বিধায়ক সায় দিয়েছেন তার সপ্রমাণ তালিকা জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিধানসভার সচিব এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এটি কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত নয়, বরং সম্পূর্ণ একটি আইনানুগ ও নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া মাত্র। ‘বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি মেম্বার্স এমোলিউমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৩৭’-এর ‘এক্সপ্ল্যানেশন ২’ (Explanation 2) ধারা অনুযায়ী, বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতির বিষয়ে চূড়ান্ত ও একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার কেবল বিধানসভার অধ্যক্ষেরই রয়েছে। এই পদের মর্যাদা বজায় রাখার জন্য এবং দলত্যাগের আইন বা অন্যান্য আইনি জটিলতা এড়াতে স্পিকার যে কোনও রাজনৈতিক দলের কাছে এই ধরনের নথিপত্র ও তথ্য দাবি করতেই পারেন। অতীতের উদাহরণ টেনে সচিব আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের আমলেও ঠিক এই ধরনের একটি আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ফলে ইতিহাসের সেই নজিরকে সামনে রেখে এবং আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কোনওরকম তাড়াহুড়ো করতে নারাজ স্পিকারের দপ্তর।
এদিকে বিধানসভার অলিন্দে নিজের প্রাপ্য কক্ষ ও পদের স্বীকৃতি পেতে এবার সরাসরি ময়দানে নেমে পড়েছেন খোদ প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। দলের এই অসতর্ক তালিকা পাঠানোর ভুলের খেসারত যাতে তাঁকে বেশিদিন দিতে না হয়, তার জন্য তিনি নিজেই এবার একটি অভিনব আইনি চাল চাললেন। বিধানসভার এই প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হওয়ার পরপরই তিনি একপ্রকার বাধ্য হয়েই তথ্য জানার অধিকার আইন বা আরটিআই (RTI)-এর আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বিধানসভা সচিবালয়ের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আরটিআই আবেদন পেশ করে জানতে চেয়েছেন যে, অতীতে বিশেষ করে ২০১১ এবং ২০১৬ সালে যখন এ রাজ্যে বামফ্রন্ট বা কংগ্রেস বিরোধী আসনে বসেছিল, তখন কীভাবে এবং কী কী পদ্ধতি অবলম্বন করে বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ও তার মান্যতা দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলি স্পিকারের কাছে কী ধরনের নথিপত্র জমা দিয়েছিল, তার একটি নিখুঁত প্রতিলিপিও তিনি দেখতে চেয়েছেন। বিধানসভা সূত্রের খবর, আইন ও নিয়মের গণ্ডির মধ্যে থেকে সঠিক সময়ে এই আরটিআই-এর জবাব দেওয়া হবে। তবে সামগ্রিক এই পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের মতো একটি প্রথম সারির সর্বভারতীয় দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পাঠানোর ক্ষেত্রে এমন অপেশাদার বা পদ্ধতিগত ভুল কীভাবে হতে পারে, তা নিয়ে দলের ভেতরেই অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করছেন। রেজোলিউশনের নতুন এবং ত্রুটিমুক্ত কপি পুনরায় স্পিকারের দপ্তরে জমা না পড়া পর্যন্ত বিধানসভার ‘বিরোধী দলনেতা’র সেই মর্যাদাপূর্ণ ঘরে এখনই আলো জ্বলছে না, এবং শোভনদেব-ফিরহাদদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আপাতত লালফিতের ফাঁসেই আটকে রইল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

