AB Live News
পাকিস্তানকে চুনকাম করে ভারতকে টপকাল বাংলাদেশ
বিশ্ব ক্রিকেটে এক নতুন ইতিহাস লিখে নিজের দেশের মাটিতে পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ। এই অভূতপূর্ব ও মহাকাব্যিক ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় কেবল ক্রিকেট ময়দানেই উৎসবের আবহ তৈরি করেনি, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডাব্লিউটিসি) পয়েন্ট তালিকাতেও এক ওলটপালট এনে দিয়েছে। সিলেটের মাঠে দ্বিতীয় টেস্টে দুর্দান্ত খেলে ৭৮ রানে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার পর বিশ্বমঞ্চে একলাফে পঞ্চম স্থানে উঠে এল বাংলাদেশ। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী টিম ইন্ডিয়ার ওপর, কারণ একধাপ নেমে আপাতত ছয় নম্বরে চলে যেতে হল ভারতকে। ফলে পয়েন্ট শতাংশের বিচারে রোহিত শর্মার ভারতীয় দলকে পেছনে ফেলে টেস্টের বিশ্বমঞ্চে এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। কোনও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বা টেস্টের ক্রমতালিকায় ভারতের মতো শক্তিশালী দলকে টপকে যাওয়ার এই ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান পয়েন্ট টেবিল খতিয়ে দেখলে এই অভাবনীয় পরিবর্তনের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সিরিজ জয়ের সুবাদে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এখন মাত্র চার ম্যাচে ৫৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট সংগ্রহ করে অত্যন্ত মজবুত অবস্থানে থেকে টেবিলের পাঁচ নম্বরে জাঁকিয়ে বসেছে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়টা বেশ খারাপ যাচ্ছে ভারতের। টিম ইন্ডিয়ার পয়েন্ট শতাংশ বেশ কিছুটা নেমে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৮.১৫-তে। এই গাণিতিক ব্যবধানের কারণেই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মর্যাদাপূর্ণ লড়াইয়ে ভারত এখন আপাতভাবে বাংলাদেশের নিচে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্য দিকে, এই পরাজয়ের পর পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় রচিত হল। কিছুদিন আগেই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে লজ্জাজনক হারের মুখ দেখতে হয়েছিল বাবর আজমদের, আর এবার ঘরের মাঠে দাপট দেখানোর পর বাংলাদেশের কাছে নিজেদের ডেরায় এসেও চুনকামের চরম লজ্জা গ্রাস করল তাদের। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার জেরে পাকিস্তান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তালিকায় এক ধাক্কায় আট নম্বরে নেমে গিয়েছে। তাদের পয়েন্ট শতাংশ তলানিতে ঠেকে এখন মাত্র ৮.৩৩। পাকিস্তানের নিচে এই মুহূর্তে কেবল রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যা পাক ক্রিকেটের দৈন্যদশাকেই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরল। আর এই তালিকায় সবার শীর্ষে রাজত্ব করছে অস্ট্রেলিয়া, যাদের পয়েন্ট শতাংশ ৮৭.৫০ এবং তাদের ঠিক পরেই যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
সিলেটে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক টেস্টের পঞ্চম তথা শেষ দিনে ম্যাচের ভাগ্য কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা ছিল। চতুর্থ দিনের শেষে পাকিস্তানের স্কোর ছিল ৭ উইকেটে ৩১৬ রান। ম্যাচ জিততে হলে শেষ দিনে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল আরও ১২১ রান, আর হাতে ছিল মাত্র ৩টি উইকেট। ক্রিজে লড়াই চালাচ্ছিলেন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উইকেটকিপার ব্যাটার মহম্মদ রিজওয়ান এবং টেল-এন্ডার সাজিদ খান। কিন্তু আজ, বুধবার সকালে খেলা শুরু হতেই বাংলাদেশ দল ম্যাচ নিজেদের পকেটে পুরতে একেবারেই বেশি সময় নষ্ট করেনি। মাত্র ৪২ রান যোগ করার পরেই পাকিস্তানের শেষ তিনটি উইকেটের পতন ঘটে এবং শুরু হয় বাংলাদেশের বিজয়োৎসব। আর এই জয়ের প্রধান রূপকার বা নায়ক হলেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ বাঁ-হাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। পিচের ফায়দা তুলে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও বিষাক্ত বোলিং করে ৩৪.২ ওভারে ১২০ রান খরচ করে একাই ছিনিয়ে নেন ৬টি মূল্যবান উইকেট। পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি কার্যত একাই প্রতিপক্ষের ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। শুধু দ্বিতীয় ইনিংসই নয়, ম্যাচের প্রথম ইনিংসেও তাইজুল সমান উজ্জ্বল ছিলেন এবং ৩টি উইকেট শিকার করেছিলেন। ফলে ম্যাচে মোট ৯ উইকেট নিয়ে তিনি ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার দাবিদার হয়ে ওঠেন। আজ সকালে প্রথম বড় ধাক্কাটি তাইজুলই দিয়েছিলেন সাজিদ খানকে ফিরিয়ে। ২৮ রান করে সাজিদ আউট হতেই রিজওয়ানের সঙ্গে তাঁর গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ ৫৪ রানের জুটিটি ভেঙে যায় এবং পাকিস্তানের শেষ লড়াইয়ের আশাটুকুও ওখানেই শেষ হয়ে যায়।
পাকিস্তানের পক্ষে আজ একমাত্র মহম্মদ রিজওয়ানই একা কুম্ভ হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কন্ডিশন ও বোলিংয়ের সামনে মাথা ঠান্ডা রেখে ১৬৬ বলে দুর্দান্ত ৯৪ রানের একটি ইনিংস খেলেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার। দিনের শুরুতে বাংলাদেশের তরুণ পেসার নাহিদ রানাকে পরপর দুটি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি মেরে তিনি বাংলাদেশ শিবিরের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি করার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের অধিনায়ক শান্তর নিখুঁত ফিল্ডিং সাজানোর সুবাদে শরিফুল ইসলামের একটি অফ-স্টাম্পের বাইরের বল ড্রাইভ করতে গিয়ে গালিতে ক্যাচ দিয়ে বসেন রিজওয়ান। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৬ রান দূরে থাকা রিজওয়ান আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরতেই খেলার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে আসে বাংলাদেশের হাতে। এর ঠিক পরের ওভারেই নতুন ব্যাটার খুররম শাহজাদকে শূন্য রানে বোল্ড করে পাকিস্তানের ইনিংসের যবনিকা টেনে দেন স্পিন জাদুকর তাইজুল ইসলাম। জয়ের জন্য পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য ছিল পাহাড়প্রমাণ ৪৩Target রান, কিন্তু বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে পাকিস্তানের ইনিংস গুটিয়ে যায় মাত্র ৩৫৮ রানে।
এই সিরিজ জয়ের আসল তাৎপর্য ও গভীরতা কিন্তু অন্য জায়গায় লুকিয়ে রয়েছে। নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে এই প্রথমবার নিজেদের দেশের মাটিতে পাকিস্তানকে কোনও টেস্ট সিরিজে সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, এর আগে ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে তাদের ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে আসার যে গৌরবময় নজির বাংলাদেশ গড়েছিল, এবারও ঠিক একই ব্যবধানে সিরিজ জিতে সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাল তারা। অর্থাৎ, বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে টানা দ্বিতীয়বার পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার এক বিরল ও অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করল বাংলাদেশ দল। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের নেপথ্যে বল হাতে তাইজুল যেমন ভেলকি দেখিয়েছেন, তেমনই ব্যাট হাতেও দলের দুই অভিজ্ঞ সেনানী লিটন দাস ও মুশফিকুর রহিম অসামান্য অবদান রেখেছেন। সিরিজের এই দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে যখন দল বিপদে ছিল, তখন লিটন দাসের ব্যাট থেকে আসে এক অনবদ্য ১২৬ রানের ইনিংস। আবার দ্বিতীয় ইনিংসে দলের লিডকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যেতে মুশফিকুর রহিমের ব্যাট থেকে আসা ঝকঝকে ১৩৭ রানের ইনিংসটি বাংলাদেশকে এক বিশাল রানের পুঁজি এনে দিয়েছিল। এই সিনিয়র ক্রিকেটারদের দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং বোলারদের সম্মিলিত আগ্রাসনের ওপর ভর করেই রচিত হল বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই সোনালী অধ্যায়, যা বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে তাদের অবস্থানকে আরও শক্ত করল।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

