AB Live News
থিয়েটার রোড টু চণ্ডীতলা ‘ডিউজ বল’ ট্র্যাজেডি
অসীম ধর : বাংলা থিয়েটারের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও নজিরবিহীন নাট্যমুহূর্তের সাক্ষী থাকল হুগলির চণ্ডীতলা। রাজনীতির ময়দান রাতারাতি রূপান্তরিত হল যাত্রামঞ্চে, আর সেই মঞ্চের একক ‘মহাগুরু’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন শ্রীরামপুরের বিদগ্ধ তৃণমূল সাংসদ তথা খ্যাতনামা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সোনারপুরে সতীর্থ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর শনিবাসরীয় ‘ডিম-ইট-পাথর’ বর্ষণের মহাকাব্যিক নাটকের রেশ কাটতে না কাটতেই, রবিবারের চণ্ডীতলায় মঞ্চস্থ হল তার দ্বিতীয় অঙ্ক। দলীয় কর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে থানায় স্মারকলিপি দিতে যাওয়ার এক অতি সাধারণ চিত্রনাট্যকে নিজের অসামান্য অভিনয় দক্ষতায় যেভাবে তিনি ট্র্যাজেডিতে রূপান্তর করলেন, তা দেখে আপ্লুত এলাকার দর্শককুল। গেরুয়া শিবিরের ‘চোর চোর’ কোরাসের আবহে, মাথায় আলতো চোট লাগামাত্রই পিচের রাস্তাকেই গ্রিন-রুম বানিয়ে সাংসদের লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যটি টলিউডের তাবড় অভিনেতাদেরও ঈর্ষায় ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রসিক মহল। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং এই ঐতিহাসিক অভিনয়কে আরও বেশি ‘সুরক্ষিত’ করতে চণ্ডীতলা থানার বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।
নাটকের শুভারম্ভ হয় রবিবার দুপুরে। সাধারণত হেভিওয়েট নেতারা বিশাল কনভয় আর অনুগামীদের ফৌজ নিয়ে চললেও, শ্রীরামপুরের সাংসদ এদিন বেছে নিয়েছিলেন ‘একলা চলো রে’র এক সুপরিকল্পিত ট্র্যাজিক ইমেজ। চণ্ডীতলা মোড়ের মাথায় তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে যখন মাত্রাধিক্য চিৎকারে সাধারণ ‘ডায়লগ থ্রোয়িং’ চলছে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে প্রবেশ ঘটে তাঁর। বিজেপি কর্মীদের কালো পতাকা প্রদর্শন এবং চোর স্লোগানের তীব্র ‘ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক’-এর মাঝেই ঘটে সেই চরম ক্লাইম্যাক্স। সাংসদের দাবি অনুযায়ী, গেরুয়া ফেট্টি পরিহিত ছয়-সাতজন কুশীলব নাকি তাঁর দিকে এক রহস্যময় গোলক ছুঁড়ে মারে। মাথায় সেই গোলকের ছোঁয়া লাগামাত্রই সময় নষ্ট না করে, দুই হাত মাথায় দিয়ে প্রকাশ্য রাজপথের ধুলোবালি মাখা পিচেই ‘শয়ন মুদ্রা’ ধারণ করেন প্রবীণ সাংসদ। দৃশ্যটি এতটাই জীবন্ত ছিল যে, অনুগামীরা তড়িঘড়ি ছুটে এসে তাঁর মাথায় ঘটি ঘটি জল ঢেলে ‘সিন’ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন।
রাস্তায় শুয়ে থাকার প্রথম দৃশ্যটি সফলভাবে সম্পন্ন করার পর শুরু হয় নাটকের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে আকর্ষক অংশ—‘মেলোড্রামা’। ধরাধরি করে রাস্তা থেকে তোলার পর, ক্ষতবিক্ষত নায়কের মতো এক হাতে মাথা চেপে এবং অন্য হাতে কাঁপা কাঁপা গলায় মাইক ধরে রীতিমতো অশ্রুবিসর্জন শুরু করেন সাংসদ। চোখে জল এবং গলায় অনন্ত আকুলতা নিয়ে তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমি তো কাউকে না নিয়ে একা একা আসছিলাম গা বাঁচাতে। কিন্তু চণ্ডীতলা মোড়ের সামনে বিজেপির লোকজন আমার দিকে কী ছুঁড়ে মারল ভগবান জানে! ওটা কি আইপিএলের ডিউজ বল নাকি অন্য কিছু ভারী বস্তু, আমি তো ক্রিকেট খেলি না যে বুঝতে পারব!” এক প্রকার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে কেদেই জনতাকে সাক্ষী মেনে তিনি আপশোস করেন, “আমার আর কথা বলার মতো শক্তি নেই গা! চণ্ডীতলার ভগবানতুল্য পাবলিকই এখন এই অন্যায়ের বিচার করুক। আচ্ছা, আপনারা বলুন তো, একজন প্রবীণ সাংসদকে রাস্তায় এইভাবে ধরে ধরে মারলে সিনেমার টিআরপি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এটা কোনও সাধারণ জনরোষ হতেই পারে না, এটা স্রেফ গুটি কয়েক গেরুয়া ফেট্টির সাজানো চক্রান্ত!”
কান্নায় ভেজা এই নাটকের শেষ দৃশ্যে টুইস্ট আনতে সাংসদ সাহেব এক কাল্পনিক ‘মোটরসাইকেল আরোহী নারী’র চরিত্রকেও সংলাপে টেনে আনেন। তিনি দাবি করেন, রাস্তায় পড়ে থাকার সময় নাকি এক অজ্ঞাতপরিচয় ভদ্রমহিলা বাইক থামিয়ে তাঁর কানে কানে এসে কান্নাকাটি করে এক মস্ত স্ক্রিপ্ট শুনিয়ে গিয়েছেন। সেই মহিলার বয়ান নকল করে কল্যাণবাবু বলেন, “ভদ্রমহিলা আমায় দেখে বললেন, ওগো দাদা, আমাদের প্রচণ্ড মেরেছে গো বিজেপির লোক! গোটা বাংলায় তারা নাকি আমাদের এমন মার মারছে যে, ঘাসফুল শিবিরকে পুরোপুরি সাফ করে দিয়ে শূন্যস্থানে সিপিএম আর কংগ্রেসের মতো ঘুমন্ত দলগুলোকে জায়গা করে দিতে চাইছে!” পরপর দু’দিন দুই সাংসদের এই ধারাবাহিক ‘অন-স্টেজ পারফরম্যান্স’ দেখে আমজনতা অবশ্য বেশ বিভ্রান্ত। বিরোধীদের একাংশের টিপ্পনী, অভিনয় যদি করতেই হয়, তবে তা বেশ কোমর বেঁধেই করা উচিত—তাতে ডিউজ বল আসুক আর লেদার বল। তবে রাজনীতি আর থিয়েটারের এই মেলবন্ধনে চণ্ডীতলার চত্বর এখন রীতিমতো থমথমে, আর পর্দার আড়ালে থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনী অনবরত রুট মার্চ করে হাততালির আবহ বজায় রাখছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

