AB Live News
ঋতুকালীন ছুটি ছাত্রীদের
নারী সার্থকতা ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করতে চলেছে কেরল সরকার। স্কুলপড়ুয়া ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার কথা মাথায় রেখে এবার তাদের জন্য প্রতি মাসে নির্দিষ্ট ঋতুকালীন ছুটির ব্যবস্থা করার কথা গুরুত্ব সহকারে ভাবছে রাজ্য। সম্প্রতি কেরল বিধানসভায় রাজ্য সরকারের এই নতুন ও অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রস্তাবটির কথা সরকারিভাবে তুলে ধরেছেন স্বয়ং রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকর। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে রাজ্যের এই পরিকল্পনাকে সমাজকল্যাণ ও নারী সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে বিভিন্ন মহল। বিধানসভায় এই নতুন কর্মসূচির কথা ঘোষণা করার সময় রাজ্যপাল স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইউডিএফ সরকারের এই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের ফলে রাজ্যের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পাবলিক স্পেস বা জনপরিসর মেয়ে তথা সামগ্রিকভাবে নারীদের যাতায়াত ও অবস্থানের জন্য আরও অনেক বেশি সহজ, সুরক্ষিত এবং স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠবে। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় ঋতুস্রাব নিয়ে প্রচলিত নানাবিধ জড়তা ও ট্যাবু ভেঙে ছাত্রীদের শারীরিক সমস্যার দিনগুলিতে উপযুক্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
সরকারের পেশ করা এই নয়া প্রস্তাবের নীল নকশা অনুযায়ী, স্কুলছাত্রীদের শারীরিক ক্লেশ ও অস্বস্তির দিনগুলিতে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ তিন দিন পর্যন্ত ঋতুকালীন ছুটি মঞ্জুর করার এক বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এই বিশেষ ছুটি ঘোষণার পাশাপাশিই শিক্ষা মহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড়সড় প্রশ্ন এবং গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল যে, প্রতি মাসে যদি নিয়ম করে ছাত্রীরা তিন দিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে, তবে তাদের শিক্ষাবর্ষের নির্ধারিত পড়াশোনা এবং সিলেবাস শেষ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না। তবে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের এই আশঙ্কার অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সমাধানও সূত্রায়িত করেছে নবনির্বাচিত ইউডিএফ সরকার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানানো হয়েছে যে, ঋতুকালীন ছুটির কারণে ছাত্রীরা যাতে পড়াশোনার দৌড়ে কোনওভাবেই পিছিয়ে না পড়ে, তা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা হবে। এই উদ্দেশ্যে রাজ্য শিক্ষা দফতর প্রতিটি বিদ্যালয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলিতে বা অন্য কোনও সুবিধাজনক সময়ে অতিরিক্ত ক্লাসের বিশেষ ব্যবস্থা করবে। এই অতিরিক্ত ও পরিপূরক ক্লাসগুলির মাধ্যমে ছাত্রীদের সেই সমস্ত খামতি ও বকেয়া পড়া নিমেষেই পূরণ করে দেওয়া হবে, যা তারা ছুটির দিনগুলিতে মিস করেছিল। ফলে পড়াশোনার মান যেমন বজায় থাকবে, তেমনই ছাত্রীদের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও কোনওরকম আপস করতে হবে না।
মহিলা ও শিশুদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণে কেরলের বর্তমান ইউডিএফ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক জনমুখী ও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে ভি ডি সতীশন সরকারের এই দূরদর্শী পরিকল্পনা ও রূপরেখাটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন রাজ্যপাল। ছাত্রীদের ছুটির পাশাপাশি রাজ্যের কর্মজীবী মহিলাদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নত করতেও একগুচ্ছ নয়া দিশা দেখিয়েছে সরকার। রাজ্যপাল জানান, রাজ্য সরকার এবার ১৯৬১ সালের মাতৃত্বকালীন সুবিধা আইনের অধীনে থাকা বিভিন্ন নিয়মকানুনের পরিধি আরও বিস্তৃত করে শিশুদের উপযুক্ত পরিচর্যা সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাজ্যের সমস্ত সরকারি দফতর, বড় ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, আইটি পার্ক এবং এমন সমস্ত বেসরকারি বা বাণিজ্যিক ক্ষেত্র, যেখানে ন্যূনতম ৫০ জন বা তার বেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন, সেইসব জায়গায় বাধ্যতামূলকভাবে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও উন্নতমানের চাইল্ড কেয়ার সেন্টার বা শিশু যত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যাপারে কড়া নির্দেশিকা জারি করা হবে। এর ফলে কর্মরতা মায়েরা তাঁদের সন্তানদের সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে নিশ্চিন্তে নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, যা কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজের মান ও মানসিক শান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
এখানেই শেষ নয়, কেরলের নারী সমাজকে আরও বেশি স্বাবলম্বী এবং সুরক্ষিত করতে রাজ্যপালের ভাষণে একঝাঁক নতুন আশার আলো দেখা গিয়েছে। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন যে, পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে সমস্ত কর্মীর জন্য সমকাজে সমবেতন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করবে কেরল সরকার। একইসঙ্গে রাজ্যের প্রতিটি ছোট-বড় ও প্রধান শহরের ব্যস্ততম রাস্তা এবং জনবহুল এলাকাগুলিতে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পাবলিক টয়লেট বা শৌচাগার নির্মাণ করা হবে, যা এতদিন পথচলতি মহিলাদের জন্য একটি মস্ত বড় সমস্যা ছিল। কর্মরতা মহিলাদের জন্য কেরল সরকার আরও বেশ কিছু কল্যাণমূলক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে, যার মধ্যে অন্যতম হল পূর্ণকালীন ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা প্রদান। এছাড়া সমাজের প্রান্তিক স্তরের মেয়েদের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার কথা চিন্তা করে স্যানিটারি ন্যাপকিন, জুতো এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী যাতে অত্যন্ত সহজে এবং সুলভ মূল্যে সবার হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া যায়, তার জন্য রাজ্যজুড়ে একটি বিশেষ ও সুসংহত বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সোপান তৈরি করছে সরকার। সব মিলিয়ে কেরল সরকারের এই বহুমুখী উদ্যোগ ভারতের অন্যান্য রাজ্যের কাছেও আগামী দিনে নারী কল্যাণের এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে চলেছে বলে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

