AB Live News
চাঁদার নামে হেনস্থা রুখতে পুলিশের হেল্পলাইন, নজরে পুজো উদ্যোক্তারা
শ্রীতমা ব্যানার্জী :: দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির আবেগ, উৎসব, পাড়ার মানুষের মিলন। পুজোর ক’টা দিন ঘিরে মাসের পর মাস ধরে চলে প্রস্তুতি। কোথাও মণ্ডপ তৈরি হচ্ছে, কোথাও প্রতিমার কাজ শেষের পথে, আবার কোথাও চলছে আলোকসজ্জার পরিকল্পনা। কিন্তু এই উৎসবের আনন্দের আড়ালে প্রতি বছরই উঠে আসে একটি অস্বস্তিকর অভিযোগ—পুজোর চাঁদার নামে জোরজবরদস্তি।এবার সেই অভিযোগের মোকাবিলায় আরও কড়া অবস্থান নিল কলকাতা পুলিশ। পুজোর চাঁদা দিতে গিয়ে কোনও ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী যদি হেনস্থা, চাপ বা জবরদস্তির শিকার হন, তা হলে সরাসরি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো যাবে। এর জন্য চালু করা হয়েছে টোল-ফ্রি হেল্পলাইন এবং হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, জোর করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
এক ফোনেই জানানো যাবে অভিযোগ
কলকাতা পুলিশের তরফে দেওয়া হয়েছে টোল-ফ্রি নম্বর ১৮০০৩৪৫৫৬৭৮। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর জন্য রয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ৯৪৩২৬২৪৩৬৫। পুজোর চাঁদা দেওয়ার জন্য কেউ যদি জোর করেন, ভয় দেখান, রাস্তা আটকে টাকা চান অথবা টাকা না দেওয়ায় কোনও ধরনের হেনস্থার শিকার হতে হয়, সে ক্ষেত্রে এই নম্বরগুলিতে যোগাযোগ করার আবেদন জানিয়েছে পুলিশ।পুলিশের বার্তা স্পষ্ট—উৎসবের নামে কোনও নাগরিককে জোর করে টাকা দিতে বাধ্য করা যাবে না। পুলিশের এক আধিকারিকের কথায়, জোর করে চাঁদা আদায়ের কোনও ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষকে চুপ না থেকে বিষয়টি জানাতে হবে।শুধু কলকাতা নয়, গোটা রাজ্যেই দুর্গাপুজোকে ঘিরে হাজার হাজার ক্লাব ও পুজো কমিটি সক্রিয় থাকে। পুজোর বাজেটের একটি বড় অংশ আসে চাঁদা ও স্পনসরশিপ থেকে। ফলে পুজোর আগে চাঁদা সংগ্রহের ছবিও কলকাতার রাস্তায় খুব পরিচিত। কিন্তু স্বেচ্ছায় দেওয়া অনুদান আর জোর করে টাকা আদায়ের মধ্যে যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, সেটিই এ বার আরও জোর দিয়ে মনে করিয়ে দিল পুলিশ।
বদলেছে চাঁদা সংগ্রহের ছবিও
গত কয়েক বছরে কলকাতায় ছোট ও মাঝারি পুজো কমিটির একটি অংশ কর্পোরেট স্পনসরশিপের উপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছে। ফলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাঁদা তোলার প্রবণতা কিছুটা কমেছে বলে পুলিশের কাছে আসা অভিযোগের প্রবণতায় দেখা গিয়েছে। তবে এ বছর স্পনসরশিপ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় কিছু পুজো উদ্যোক্তার মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার এক পুজো উদ্যোক্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রতি বছর যে সংস্থাগুলি পুজোর বিজ্ঞাপনে টাকা দেয়, এ বার তাদের অনেকেই এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। পুজোর আর বেশি দেরি নেই, অথচ রাস্তাঘাটে বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংয়ের সংখ্যাও তুলনামূলক ভাবে কম চোখে পড়ছে বলে তাঁর দাবি।একই ধরনের কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞাপন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তিও। তাঁর বক্তব্য, কয়েকটি বড় সংস্থা এখনও ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ অবস্থানে রয়েছে। পুজোর ব্র্যান্ডিংয়ে কতটা বিনিয়োগ করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনও অনেকেই নেয়নি। তবে অর্থের টানাপোড়েন বা স্পনসর কমে যাওয়া—কোনও কারণই জোর করে চাঁদা আদায়ের যুক্তি হতে পারে না বলে পুলিশ স্পষ্ট করেছে। জবরদস্তি করে টাকা আদায়ের চেষ্টা হলে সেটিকে ‘এক্সটরশন’ বা তোলাবাজি হিসেবে দেখা হবে।
অভিযোগের ইতিহাসও কম নয়
পুজোর চাঁদা নিয়ে চাপ সৃষ্টি বা হেনস্থার অভিযোগ নতুন নয়। অতীতে কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। কয়েক বছর আগে দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কে এক ক্যাফে মালিক অভিযোগ করেছিলেন, স্থানীয় পুজো উদ্যোক্তারা তাঁর কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছিলেন। সেই টাকা দিতে অস্বীকার করার পর তাঁকে হেনস্থার অভিযোগও ওঠে। ২০২৩ সালে কালীপুজোর সময় একটি ক্লাবের সদস্যদের বিরুদ্ধে রাস্তায় একটি ট্রাক থামিয়ে ৫ হাজার টাকা চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। চালক টাকা দিতে অস্বীকার করলে প্রথমে বচসা এবং পরে তা হাতাহাতিতে গড়ায়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনাও ছড়িয়েছিল।একই বছরে নদিয়ায় চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় এক চিকিৎসককে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। আবার গত কালীপুজোর সময় মানিকতলার এক বাসিন্দা ২,০০১ টাকা চাঁদা দিতে দেরি করায় মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছিলেন। তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগও দায়ের করেন।এ ধরনের ঘটনা যে আরও ঘটে, কিন্তু সব সময় থানায় অভিযোগ পৌঁছয় না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা স্থানীয় সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে চান না। ফলে পুলিশের কাছে পৌঁছনো অভিযোগের সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতির সম্পূর্ণ ছবি নাও হতে পারে।
উৎসবের আনন্দে যেন ভয় না মেশে
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও অন্যতম বড় উৎসব। পাড়ার পুজোকে ঘিরে মানুষের অংশগ্রহণ, চাঁদা দেওয়া, মণ্ডপ তৈরিতে সহযোগিতা—সবই দীর্ঘদিনের সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু সেই অংশগ্রহণ তখনই স্বতঃস্ফূর্ত থাকে, যখন মানুষের ইচ্ছার মর্যাদা থাকে। চাঁদা দেওয়া হবে কি না, কত টাকা দেওয়া হবে—এই সিদ্ধান্ত নাগরিকের নিজের হওয়া উচিত। কোনও চাপ, ভয় বা হেনস্থা সেই স্বাভাবিক সম্পর্ককে নষ্ট করে দিতে পারে।এই জায়গাতেই পুলিশের নতুন হেল্পলাইন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অভিযোগ জানানোর একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকলে সাধারণ মানুষ অন্তত জানবেন, সমস্যায় পড়লে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে।পুজোর মরসুম যত এগোবে, কলকাতার রাস্তায় তত বাড়বে ব্যস্ততা। মণ্ডপে আলো জ্বলবে, ঢাকের শব্দ শোনা যাবে, নতুন পোশাকে শহর ভাসবে উৎসবের আনন্দে। সেই আনন্দের মধ্যে যেন চাঁদার নামে কোনও সাধারণ মানুষকে অস্বস্তি বা আতঙ্কের মুখে পড়তে না হয়—এ বার সেই বার্তাই দিতে চাইছে কলকাতা পুলিশ।
জোর করে চাঁদা নয়, উৎসব হোক স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

