Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

পলাতক বিডিও প্রশান্ত বর্মনের জামিন

0 117,903,485

সল্টলেকের স্বর্ণব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা খুনকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। কলকাতা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট— একের পর এক আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও আত্মসমর্পণ করেননি তিনি। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, খুনের মামলায় নাম জড়ানোর পর থেকেই কার্যত আত্মগোপন করে ছিলেন রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মন। অবশেষে মদ্যপ অবস্থায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে পথচারীকে ধাক্কা মারার ঘটনায় পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও মঙ্গলবার রাতে বারাসত আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন সেই অভিযুক্ত প্রশাসনিক আধিকারিক। আর সেই জামিন ঘিরেই তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। কারণ, আদালতে সময়মতো পৌঁছয়নি খুনের মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথি। হাজির ছিলেন না তদন্তকারী আধিকারিকও। ফলে শুধুমাত্র পথচারীকে ধাক্কা মারার মামলায় এক হাজার টাকার বন্ডে জামিন পেয়ে যান প্রশান্ত বর্মন।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক মহল, আইনজীবী মহল এবং রাজনৈতিক অন্দরেও শুরু হয়েছে প্রবল চর্চা। প্রশ্ন উঠছে, এত বড় একটি খুনের মামলার মূল অভিযুক্ত আদালতে হাজির থাকার পরও কেন তদন্তকারী আধিকারিক অনুপস্থিত থাকলেন? কেন আদালতে পৌঁছল না খুনের মামলার কাগজপত্র? আদৌ কি কোনও গাফিলতি ছিল, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ? ইতিমধ্যেই এই নিয়ে নানা মহলে চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, নিউটাউনে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর সময় এক পথচারীকে ধাক্কা মারেন প্রশান্ত বর্মন। গুরুতর জখম হন মমতাজুল সেখ নামে ওই ব্যক্তি। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবাদ জানাতে এগিয়ে এলে অভিযুক্ত বিডিওর আচরণ ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রতিবাদকারী যুবকদের উদ্দেশে চড়াও হচ্ছেন তিনি। অভিযোগ, দুর্ব্যবহার, গালিগালাজ, এমনকি মোবাইল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেন। যদিও সেই ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই নতুন করে সামনে আসে বহুদিনের পলাতক ওই অভিযুক্তের উপস্থিতি। এরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মঙ্গলবার তাঁকে বারাসত আদালতে তোলা হলে তদন্তকারীদের তরফে আশা করা হয়েছিল, খুনের মামলার প্রসঙ্গও সামনে আনা হবে। কারণ, স্বপন কামিল্যা খুনের ঘটনায় আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আত্মসমর্পণ করেননি প্রশান্ত বর্মন। বিধাননগর আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছিল। কিন্তু এদিন আদালতে সেই সংক্রান্ত নথিপত্র পৌঁছয়নি বলে জানা যায়। উপস্থিত ছিলেন না মামলার তদন্তকারী আধিকারিকও। ফলে খুনের মামলায় তাঁকে আটক রাখার আবেদন কার্যত সামনে আসেনি। আদালত তখন শুধুমাত্র পথদুর্ঘটনা ও মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর মামলার ভিত্তিতেই শুনানি করে। শেষ পর্যন্ত মাত্র এক হাজার টাকার বন্ডে জামিন মঞ্জুর হয় অভিযুক্তের।

ঘটনার পর আদালত চত্বরেই ক্ষোভ উগরে দেন একাধিক আইনজীবী। তাঁদের বক্তব্য, যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছেন, যাঁর বিরুদ্ধে খুনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে এত সহজে জামিন পাওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। বিশেষত যখন তদন্তকারী সংস্থা আদালতে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

স্বপন কামিল্যা খুনকাণ্ড ঘিরে শুরু থেকেই রহস্য এবং বিতর্ক ছিল। পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের বাসিন্দা স্বপন কামিল্যা সল্টলেক দত্তাবাদ এলাকায় স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত বছরের অক্টোবর মাসে আচমকাই নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। পরিবারের অভিযোগ ছিল, ২৮ অক্টোবর তাঁকে অপহরণ করা হয়। পরদিন নিউটাউনের যাত্রাগাছি খালপাড় এলাকা থেকে উদ্ধার হয় তাঁর দেহ। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, নিউটাউনের একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে তাঁকে খুন করা হয়েছিল। তারপর দেহ ফেলে দেওয়া হয় খালপাড় এলাকায়।

তদন্ত যত এগোয়, ততই সামনে আসতে থাকে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশ দাবি করে, এই খুনের ঘটনায় মূল চক্রীদের অন্যতম ছিলেন প্রশান্ত বর্মন। সেই সময় তিনি উত্তরবঙ্গের রাজগঞ্জ ব্লকের বিডিও পদে কর্মরত ছিলেন। তদন্তে উঠে আসে তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের নামও। ধাপে ধাপে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু প্রশান্ত বর্মন অধরাই থেকে যান। পরে দাখিল হওয়া চার্জশিটেও তাঁকে ‘পলাতক’ বলে উল্লেখ করা হয়।

এই মামলায় প্রথম থেকেই বিতর্ক ছিল আগাম জামিন নিয়েও। অভিযোগ উঠেছিল, তদন্ত চলাকালীনই প্রভাব খাটিয়ে বারাসত আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েছিলেন প্রশান্ত বর্মন। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে যায় বিধাননগর কমিশনারেট পুলিশ। হাইকোর্ট আগাম জামিন বাতিল করে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, অভিযুক্তকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশও মানেননি তিনি। পরে সুপ্রিম কোর্টেও যান প্রশান্ত বর্মন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতও তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। তবুও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ করেননি অভিযুক্ত। এরপরই বিধাননগর আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

তদন্তকারীদের দাবি, এতদিন ধরে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অথচ সেই ব্যক্তিই প্রকাশ্যে নিউটাউনের রাস্তায় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে পুলিশের ভূমিকাও নিয়ে। একজন ‘পলাতক’ অভিযুক্ত কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও সামাজিক পরিসরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন? তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কি সত্যিই কোনও তথ্য ছিল না তদন্তকারীদের কাছে? নাকি কোথাও কোনও শিথিলতা ছিল?

ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে জোর তরজা। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রভাবশালী হওয়াতেই এতদিন গ্রেপ্তার এড়িয়ে গিয়েছিলেন প্রশান্ত বর্মন। এমনকি আদালতে নথি না পৌঁছনো এবং তদন্তকারী আধিকারিকের অনুপস্থিতির ঘটনাকেও তারা অত্যন্ত রহস্যজনক বলে দাবি করছে। শাসকদলের তরফে অবশ্য এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, আইন আইনের পথেই চলবে। তদন্ত চলছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আইনজীবীদের একাংশের মতে, এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিল। আদালত নির্ভর করে তদন্তকারী সংস্থার উপস্থাপিত নথি এবং তথ্যের উপর। সেখানে যদি গুরুত্বপূর্ণ মামলার কাগজপত্রই আদালতে না পৌঁছয়, তবে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবেই। আর সেই সুযোগেই গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত কেউ আইনি সুবিধা পেয়ে যেতে পারেন।

এদিকে স্বপন কামিল্যার পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ক্ষোভ ছড়িয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, এতদিন ধরে বিচার পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছেন তাঁরা। আদালতের পর আদালত ঘুরেও মূল অভিযুক্তকে ধরা যায়নি। অবশেষে ধরা পড়ার পরও যদি তিনি এত সহজে জামিনে মুক্ত হয়ে যান, তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের উপর আস্থা কোথায় থাকবে?

মঙ্গলবার রাতের পর থেকেই নতুন করে চাপে পড়েছে বিধাননগর কমিশনারেট। তদন্তের গাফিলতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। আদালতে কেন পৌঁছল না মামলার নথি, কেন অনুপস্থিত ছিলেন তদন্তকারী আধিকারিক— তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা না এলে বিতর্ক আরও বাড়বে।

আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একটাই নাম— প্রশান্ত বর্মন। বহুদিন ধরে পলাতক থাকার অভিযোগ, খুনের মামলায় নাম, আদালতের নির্দেশ অমান্য, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়া, তারপর আচমকা মদ্যপ অবস্থায় পথদুর্ঘটনায় ধরা পড়া এবং শেষ পর্যন্ত মাত্র এক হাজার টাকার বন্ডে জামিন— গোটা ঘটনাপ্রবাহ যেন কোনও অপরাধ-রাজনীতির চিত্রনাট্যকেও হার মানাচ্ছে।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper