AB Live News
দল গোছাচ্ছেন মমতা, বড় দায়িত্বে মদন
আগামী নির্বাচনী লড়াইয়ের কথা মাথায় রেখে এবং সংগঠনের অন্দরে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে ফের একবার বড়সড় রদবদল করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব। রাজ্য রাজনীতির চেনা বৃত্তে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সাংগঠনিক চাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিফহাল মহল। গত বিধানসভা নির্বাচনে চারপাশের তীব্র রাজনৈতিক লড়াই এবং বিরোধী শিবিরের তীব্র প্রচারের মাঝেও যিনি নিজের রাজনৈতিক দুর্গ অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেই কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র এবার তাঁর সেই ধারাবাহিক ও বর্ণময় পারফরম্যান্সের এক বড়সড় পুরষ্কার পেলেন। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এবার থেকে দমদম লোকসভা সাংগঠনিক জেলার নতুন সভাপতির দায়িত্ব সামলাবেন মদন মিত্র। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিক চড়াই-উতরাই পার করা এই বর্ষীয়ান নেতার ওপর দলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই গভীর আস্থা প্রকাশ রাজ্যের শাসক দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলনেত্রীর নিজস্ব অনুপ্রেরণা ও নির্দেশেই এই গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক রদবদল প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হল। কামারহাটির মাটিতে ঘাসফুল ফুটিয়ে যিনি নিজের জনপ্রিয়তা এবং দলের প্রতি অবিচল আনুগত্যের প্রমাণ বারেবারে দিয়েছেন, তাঁর এই উত্তরণ দমদম অঞ্চলের দলীয় কর্মীদের একাংশের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।
এই রদবদলের নেপথ্যে দমদম ও ব্যারাকপুর অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও অত্যন্ত কৌতূহল উদ্দীপক। এর আগে এই বিশাল সাংগঠনিক এলাকার দায়িত্বে ছিলেন ব্যারাকপুরের প্রভাবশালী তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিক। তবে সাম্প্রতিককালে রাজনৈতিক গণ্ডি ছাড়িয়ে সাংস্কৃতিক জগতে তাঁর একটি বিশেষ পদক্ষেপ রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল। সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং নাটকের প্রতি আজীবন অনুরাগী হিসেবে পরিচিত বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য সম্প্রতি কলকাতার একটি নামী মঞ্চে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রখ্যাত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জীবন অবলম্বনে নির্মিত নাটক ‘আ-শক্তি’ দেখতে। কাকতালীয়ভাবে বা অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসার টানে, সেই নাটকের অন্যতম মুখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন খোদ তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিক। নাটকটি সমাপ্ত হওয়ার পর বিজেপির রাজ্য সভাপতি শুধু সাধারণ দর্শকের আসনে বসে হাততালি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি সরাসরি গ্রিনরুমে পৌঁছে যান এবং তৃণমূল সাংসদসহ অন্য সমস্ত অভিনেতাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানান। সেই সময় অভিনেতা পার্থ ভৌমিকের ভূয়সী প্রশংসা করে শমীক ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছিলেন যে, পার্থ যখন সক্রিয় politics বা রাজনীতিতে এসে বড় নেতা হননি, ঠিক তখন থেকেই তিনি তাঁর অভিনয় দেখে আসছেন। ফলে নেতা পার্থ তাঁর কাছে নতুন হলেও, অভিনেতা পার্থ অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রিয়। এই নিখাদ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও গ্রিনরুমের সৌজন্য বিনিময় রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা হলেও, বঙ্গ রাজনীতির বর্তমান আবহে তা নিয়ে নানা গুঞ্জন ও জল্পনা তৈরি হতে সময় নেয়নি। আর তার পরেই দমদমের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে পার্থ ভৌমিককে সরিয়ে মদন মিত্রের হাতে সেই গুরুভার তুলে দেওয়া অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দমদম লোকসভা সাংগঠনিক জেলার পাশাপাশি একই দিনে বড়সড় রদবদলের হাওয়া লেগেছে তৃণমূলের যুব সংগঠনেও। দলের প্রকাশিত অপর একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, তৃণমূল যুব কংগ্রেসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত দক্ষিণ কলকাতা জেলার নতুন সভাপতি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে শ্রীদীপ দাসকে। এই অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পদে এর আগে দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন সার্থক বন্দ্যোপাধ্যায়। হঠাৎ করে দক্ষিণ কলকাতার মতো খাসতালুকে যুব সংগঠনের রাশ হাতবদল হওয়া নিয়ে দলের অন্দরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে এই পদচ্যুতি বা দায়িত্ব বদল নিয়ে বিদায়ী যুব সভাপতি সার্থক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সংযত ও সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই বিষয়ে তাঁর নিজের নতুন করে কিছু বলার নেই। দলনেত্রী এবং শীর্ষ নেতৃত্ব যা ভালো মনে করেছেন, সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করেছেন এবং দল দায়িত্ব থেকে সরিয়েছে বলেই তিনি সরে গেছেন। এর বেশি কোনও তথ্য বা কারণ তাঁর জানা নেই। সার্থকের এই মন্তব্য এবং তাঁর নির্লিপ্ততা দক্ষিণ কলকাতার রাজনৈতিক অলিন্দে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে শ্রীদীপ দাসের মতো নতুন মুখকে এনে যুব সংগঠনকে আরও বেশি গতিশীল ও লড়াকু করে তোলাই মূল লক্ষ্য বলে মনে করছে ঘাসফুল শিবিরের শীর্ষ মহল।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের স্পষ্ট মত হল, আগামী দিনে যে কোনও বড় নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার আগে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং ধীরস্থিরভাবে নিজের ঘর গোছানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দমদম এবং দক্ষিণ কলকাতার মতো দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও হাইপ্রোফাইল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দলের সংগঠনকে তৃণমূল স্তর থেকে আরও বেশি মজবুত এবং নিশ্ছিদ্র করতেই এই সাংগঠনিক রদবদল করা হল। কামারহাটি বিধানসভা আসনে দলের বিপুল জয়ের পর থেকেই মদন মিত্রের সাংগঠনিক গুরুত্ব ও পরিধি যে আগামী দিনে আরও বৃদ্ধি পেতে চলেছে, সেই সংক্রান্ত জল্পনা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বাতাসে ভাসছিল। রবিবার দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সেই দীর্ঘকালীন জল্পনায় চূড়ান্ত সিলমোহর পড়ে গেল। এখন দেখার বিষয় হল, দলনেত্রীর দেওয়া এই নতুন এবং অত্যন্ত কঠিন গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আগামী দিনে দমদম লোকসভা সাংগঠনিক জেলায় দলের রাশ কতটা শক্ত করতে পারেন মদন মিত্র এবং দক্ষিণ কলকাতায় যুব সমাজকে একত্রিত করতে শ্রীদীপ দাস কতটা সফল হন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

