Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

পিচের নীচে চাপা ইতিহাস

0 590,843,278

 কলকাতার বেহালার অন্যতম ব্যস্ত এবং সুপরিচিত রাস্তা ‘জেমস লং সরণি’। প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি, ট্রাম, বাস আর মানুষের চিরপরিচিত কোলাহলে মুখরিত এই রাজপথ। কিন্তু এই ব্যস্ত রাস্তার পিচের আস্তরণের নীচে যে বাংলার এক শতাব্দী প্রাচীন গৌরবময় যাতায়াতের ইতিহাস চিরতরে চাপা পড়ে রয়েছে, তা আজ হয়তো আধুনিক প্রজন্মের অনেকেরই সম্পূর্ণ অজানা। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার তৎকালীন অনুন্নত এবং দূরবর্তী গ্রামীণ অঞ্চলগুলির সঙ্গে কলকাতার মূল ভূখণ্ডের সংযোগস্থাপনের উদ্দেশ্যে যে দূরদর্শী ও যুগান্তকারী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তারই এক জীবন্ত এবং অবিস্মরণীয় দলিল ছিল ‘কালীঘাট–ফলতা রেল’ বা সংক্ষেপে ‘কেএফআর’ (KFR)। আজ যা কেবল ইতিহাসের ধূসর পাতায় এবং বয়োবৃদ্ধদের স্মৃতিকথাতেই বন্দি হয়ে রয়ে গিয়েছে।

লন্ডনের বিখ্যাত ‘ম্যাকলেওড রাসেল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড’-এর সহযোগী সংস্থা ‘ম্যাকলেওড অ্যান্ড কোম্পানি’ বিংশ শতকের প্রথমার্ধে অবিভক্ত বাংলার বুকে চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ন্যারোগেজ রেললাইন তৈরি করেছিল। কলকাতা নগরী ও তার পারিপার্শ্বিক গ্রামীণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করাই ছিল এই রেলপথের মূল এবং দূরপ্রসারী উদ্দেশ্য। ‘ম্যাকলেওড লাইট রেলওয়েজ’ নামের এই নামী কোম্পানির অধীনে এই কেএফআর ছাড়াও আহমেদপুর-কাটোয়া, বর্ধমান-কাটোয়া এবং বাঁকুড়া-দামোদর লাইনেও নিয়মিত ছোট লাইনের ট্রেন চলাচল করত। তৎকালীন সময়ে এই ছোট লাইনের ট্রেনগুলি গ্রামীণ সাধারণ মানুষের কাছে কেবল একপ্রকার যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবন, বাণিজ্য ও জীবিকার প্রধান লাইফলাইন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার প্রত্যন্ত এলাকার কৃষিজাত পণ্য, শাকসবজি, মাছ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কলকাতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এই রেল এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিল।

সময়টা ছিল ১৯১৭ সাল। দিনটি ছিল ২৮ মে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়ে প্রায় ২৬.৯৫ মাইল দীর্ঘ কালীঘাট-ফলতা রেললাইনের আনুষ্ঠানিক ও জমকালো উদ্বোধন হয়। শুরুর দিকে বেহালার ঘোলশাপুর থেকে ফলতা পর্যন্ত এই ট্রেন চলাচল করত। পরবর্তীতে কলকাতার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযোগ আরও মজবুত, মসৃণ এবং সুদৃঢ় করতে মাঝেরহাট পর্যন্ত আরও ০.৯২ মাইল পথ সম্প্রসারণ করা হয়, যার ঐতিহাসিক উদ্বোধন হয়েছিল ১৯২০ সালের ৭ মে। মাত্র ২ ফুট ৬ ইঞ্চি চওড়া (২’৬” ন্যারোগেজ) এই সংকীর্ণ রেল ট্র্যাকে যখন কুঝিকঝিক শব্দে বাষ্পীয় ধোঁয়া উড়িয়ে ছোট ছোট ট্রেনগুলি ছুটে বেড়াত, তখন তা দেখতে রেললাইনের দুপাশের গ্রাম ও মফস্বলের উৎসুক মানুষের উপচে পড়া ভিড় জমে যেত। এই ন্যারোগেজ ট্রেনের গতি হয়তো আজকের আধুনিক ট্রেনের মতো দ্রুত ছিল না, কিন্তু তার মধ্যে জড়িয়ে ছিল এক অদ্ভুত আন্তরিকতা। লোকাল ট্রেনের কামরায় চড়ে যাত্রীদের গল্পগাছা, চেনা-পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা আর জানলা দিয়ে ভেসে আসা গ্রামীণ বাংলার সবুজ প্রকৃতি— সব মিলিয়ে এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি হত প্রতিদিন।

ভারতের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ রেল ইতিহাসে এই কেএফআর লাইনের একটি বিশেষ গৌরবময় ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান রয়েছে। এই লাইনেই সমগ্র দেশে সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল তিনটি অত্যাধুনিক ‘২-৬-২ সাইড ট্যাঙ্ক একে১৬’ (AK16) লোকোমোটিভের একটি অনন্য সেট। ইংল্যান্ডের স্ট্যাফোর্ডের বিখ্যাত ‘দ্য ক্যাসল ইঞ্জিন ওয়ার্কস’ ১৯১৬ সালের নভেম্বর মাসে এই শক্তিশালী বাষ্পীয় ইঞ্জিনগুলি নির্মাণ করে, যা ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসে ফলতা লাইনের নিয়মিত পরিষেবায় সগৌরবে যোগ দেয়। মূলত ‘আহমেদপুর-কাটোয়া’ লাইনের নামানুসারে এদের ‘একে’ (AK) ইঞ্জিন বলা হলেও, বিশ্বজুড়ে এই ইঞ্জিনগুলি ‘ডেল্টা ক্লাস’ ইঞ্জিন নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছিল। এর কারণ হল, মিশরের বিখ্যাত ‘ইজিপ্সিয়ান ডেল্টা রেলওয়ে’ সর্বপ্রথম এই অত্যাধুনিক ইঞ্জিনের অর্ডার দিয়েছিল।

মিশরে প্রথম অর্ডার দেওয়া হলেও, এই ইঞ্জিনগুলি সর্বাধিক কার্যকারিতা, সাফল্য ও বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল ভারতের মাটিতেই। বাংলার মাটির সঙ্গে এই ইঞ্জিনগুলির সম্পর্ক এতটাই নিবিড় হয়ে উঠেছিল যে, এই অভাবনীয় সাফল্যের কারণে পরবর্তী কয়েক দশকে এই ধরণের আরও বহু শক্তিশালী ইঞ্জিনের অর্ডার দেওয়া হয়, যার শেষটি এসেছিল ১৯৫৩ সালে। প্রযুক্তির এই অনবদ্য এবং রূপকথার মতো ইতিহাসের একটি অনন্য স্মারক— ১৯১৬ সালে ব্যাগনাল লোকোমোটিভের তৈরি একটি ঐতিহাসিক ইঞ্জিন— আজও দূর যুক্তরাজ্যের ‘ফিলিস রাম্পটন ট্রাস্ট’-এ পরম সযত্নে এবং মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষিত রয়েছে, যা আজও বাংলার সেই সোনালী দিনগুলির কথা বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয়।

১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বদলাতে শুরু করে। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ব্রিটিশ মালিকানাধীন ম্যাকলেওড কোম্পানি ভারত থেকে তাদের সমস্ত ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার এবং পাততাড়ি গুটানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তৎকালীন নতুন সরকারের নীতি, পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্থানীয় সড়ক পরিবহনের উন্নতির কারণে এই লাইনের রক্ষণাবেক্ষণের দিকে আর বিশেষ নজর দেওয়া সম্ভব হয়নি। কোনও উপযুক্ত অনুদান বা সরকারি সদিচ্ছার অভাবে লাইনটি ক্রমশ রুগ্ন হতে শুরু করে। ফলস্বরূপ, ক্রমাগত বিপুল আর্থিক লোকসান ও উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের চরম অভাবে ১৯৫৭ সালে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী ও আবেগের কালীঘাট-ফলতা রেললাইন। ট্রেনের সেই চেনা বাঁশি আর কুঝিকঝিক শব্দ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় বেহালা থেকে ফলতার বিস্তীর্ণ জনপদে।

রেলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরবর্তীকালে, ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার কলকাতা শহরের অভ্যন্তরীণ ও পেরিফেরাল অঞ্চলের এই রেলওয়ের অত্যন্ত মূল্যবান ও বিশাল জমি পুনরুদ্ধার করার কাজে হাত দেয়। কালের অমোঘ নিয়মে এবং দ্রুত নগরোন্নয়নের স্বার্থে একসময়ের সেই লোহার রেললাইনগুলি একে একে উপড়ে ফেলা হয়। আর যে পথ দিয়ে একসময় বাষ্পীয় ইঞ্জিন কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ফলতার দিকে দূরন্ত গতিতে ছুটে যেত, আজ সেখানে সগৌরবে গড়ে উঠেছে বেহালার আধুনিক, সুপ্রশস্ত এবং ব্যস্ততম ‘জেমস লং সরণি’। আজ সেখানে ট্রেনের চাকার আওয়াজের বদলে শোনা যায় শত শত আধুনিক যানবাহনের হর্ন। পিচের চাদরের তলায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে একটি গোটা যুগের ইতিহাস, যা ভাবলে আজও প্রবীণদের চোখে জল আসে এবং নতুনদের মনে এক অদ্ভুত বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। কোনও এক সময়ের সেই রূপকথার ট্রেন আজ কেবলই এক রূপোলী অতীত, যা আধুনিক কলকাতার গতির তলায় চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper