Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

শিক্ষকহীনতায় বন্ধ ৮ হাজারের বেশি স্কুল শিক্ষা কি তলানি‌তে? রাজস্থানের থেকেও পিছি‌য়ে বাংলা

0 59,047,703

 রাজ্যজুড়ে এখন নির্বাচনী দামামা। রাজনীতির ময়দা‌নে যখন শাসক-বিরোধী উভয় পক্ষই একে অপরকে টেক্কা দিতে ব্যস্ত, তখন বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার এক কঙ্কালসার চিত্র সাম‌নে এল। দুর্নীতির কালিমার পাশাপা‌শি এখন রাজ্যজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে একের পর এক সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার করুণ প‌রিণ‌তি। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, শুধু পরিকাঠামো বা ছাত্রের অভাব নয়, বরং শিক্ষক সংকটের তীব্রতায় পশ্চিমবঙ্গ এখন রাজস্থানের মতো রাজ্যের থেকেও শোচনীয় অবস্থায় দাঁড়িয়ে। রাজ্যে ইতিমধ্যেই ৮ হাজারের বেশি স্কুল তালাবন্ধ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। জেলায় জেলায় স্কুলগুলো যখন ধুঁকছে, তখন খোদ শিক্ষামন্ত্রীর কেন্দ্রেই বন্ধ স্কুলের অন্দরে বসছে মদের আসর। এই তীব্র শিক্ষা সংকট কি তবে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে শাসক দলের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে?

বাংলার সরকারি স্কুলগুলো মূলত প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার একমাত্র সোপান। কিন্তু সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, জেলা ও শহরের মধ্যে শিক্ষক বন্টনের ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার তুলনায় কলকাতায় শিক্ষক সংখ্যা প্রায় আড়াই গুণ বেশি। অথচ বিস্ময়করভাবে, কলকাতার স্কুলগুলোতে ছাত্রসংখ্যা জেলাগুলোর তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

এই পরিস্থিতির জন্য বিশেষজ্ঞরা মূলত সরকারের ‘উৎসশ্রী’ প্রকল্পকেই দায়ী করছেন। শিক্ষকদের নিজের বাড়ির কাছে বদলি নেওয়ার সুযোগ করে দিতে এই পোর্টাল চালু করা হলেও, তার ফল হয়েছে উল্টো। অধিকাংশ শিক্ষক জেলা থেকে কলকাতা বা তৎসংলগ্ন শহরাঞ্চলে বদলি নিয়ে চলে এসেছেন। ফলে গ্রাম বাংলার স্কুলগুলো এখন কার্যত শিক্ষকহীন। পঠন-পাঠন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে স্কুলে ঝুলছে তালা।

রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার দৈন্যদশা স্পষ্ট হয় যখন অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তুলনা টানা হয়। নথিতে দেখা যাচ্ছে, উত্তর প্রদেশে স্কুলের সংখ্যা ২ লক্ষ ৬২ হাজার ৩৫৮টি এবং রাজস্থানে ১ লক্ষ ৬ হাজার ৩০২টি। সেই তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে স্কুলের সংখ্যা ৯৩ হাজার ৭১৫টি। সংখ্যার এই ব্যবধানের চেয়েও ভয়াবহ হলো শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত। রাজস্থানে যেখানে স্কুল প্রতি গড়ে ৬ জনের বেশি শিক্ষক রয়েছেন, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের গড় ৫-এরও নিচে। অর্থাৎ, প্রতিবেশী রাজ্যগুলো যখন শিক্ষার মানোন্নয়নে এগোচ্ছে, বাংলা তখন শিক্ষক অভাবে পিছিয়ে পড়ছে।

রাজ্যের বেহাল শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে লজ্জাজনক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর নিজের বিধানসভা কেন্দ্র দমদম। সেখানকার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের খেলার মাঠের পাশের সূর্য সেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন আর ঘণ্টা বাজে না। একতলা স্কুলবাড়িটি এখন সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, যে স্কুলে একসময় শিশুদের কলরব শোনা যেত, এখন সন্ধ্যা হলেই সেখানে অসামাজিক কাজকর্ম চলে এবং নিয়মিত বসে মদের আসর। কেবল একটি নয়, দমদম বিধানসভার একাধিক স্কুলের ছবিটা একইরকম— কোথাও শিক্ষক নেই, তো কোথাও ছাত্রের অভাবে পড়াশোনা লাটে উঠেছে।

আসন্ন ভোটে এই শিক্ষক সংকটকেই প্রধান হাতিয়ার করে ময়দানে নেমেছে বিরোধী শিবির। দমদম কেন্দ্রে বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে বাম প্রার্থী তথা এসএফআই-এর প্রাক্তন সর্বভারতীয় নেতা ময়ূখ বিশ্বাস এই ইস্যুকে প্রচারের শীর্ষে রেখেছেন। ময়ূখ বিশ্বাসের স্পষ্ট বক্তব্য, সরকার পরিকল্পিতভাবে গ্রামের গরিব ঘরের সন্তানদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে। শিক্ষামন্ত্রীর নিজের এলাকায় যদি স্কুল বন্ধ হয়ে মদের আসর বসে, তবে রাজ্যের বাকি অংশের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু শিক্ষক সংকটের কথা সরাসরি অস্বীকার করতে পারেননি। তিনি স্বীকার করেছেন যে রাজ্যে শিক্ষকদের অভাব রয়েছে, তবে তাঁর দাবি, সরকার বারবার জেলায় জেলায় শিক্ষক পাঠানোর চেষ্টা চালিয়েছে এবং আগামী দিনেও করবে। যদিও এই আশ্বাস সাধারণ মানুষের মনে কতটা ভরসা জোগাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

প্রধান শিক্ষক সংগঠনের নেতা চন্দন মাইতি এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, বাংলার বহু স্কুলে এখন একজন শিক্ষককে একাই ১০০ জন ছাত্রকে সামলাতে হচ্ছে। এভাবে বিজ্ঞানসম্মত পঠন-পাঠন সম্ভব নয়। তিনি আবেদন জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের উচিত ভোটাধিকার প্রয়োগের আগে তাদের এলাকার জরাজীর্ণ ও বন্ধ হতে বসা স্কুলবাড়িগুলোর দিকে একবার তাকানো। কারণ, আজকের এই অবহেলা আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।

শিক্ষা দফতরের তথ্য অনুযায়ী, সরকার জেলায় শিক্ষক পাঠানোর নীতি তৈরি করলেও তা কেবল খাতায়-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছে। শিক্ষকদের গ্রামে যাওয়া বাধ্যতামূলক করার যে প্রস্তাব ছিল, তা কার্যকর হয়নি। ফলে শহরমুখী বদলির ঢেউয়ে গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন ধ্বংসের কিনারে। ভোটের ময়দানে এই ‘শিক্ষা সংকট’ যে শাসক শিবিরের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper