AB Live News
জুমলার মলাটে চেনা ব্লুপ্রিন্ট: বিভ্রমের ইস্তাহার বনাম রূঢ় বাস্তবতা
অধ্যাপক প্রভাস দে : বাংলার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজার সাথে সাথেই আকাশ-বাতাস চেনা প্রতিশ্রুতিতে মুখরিত হতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ধুমধাম করে বিজেপির ‘সংকল্পপত্র’ বা নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ করেছেন। পনেরো দফার সেই দলিলে মহিলাদের মাসিক ৩০০০ টাকা ভাতা থেকে শুরু করে এক কোটি বেকারের চাকরি— প্রতিশ্রুতির ঢালাও পসরা সাজানো হয়েছে। কিন্তু এই গালভরা আশ্বাসের আড়ালে যে সত্যটি উঁকি দিচ্ছে, তাকে এক কথায় বলা যায় ‘জুমলা’র পুনরাবৃত্তি। প্রশ্ন হলো, যারা উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ বা রাজস্থানে নারী নির্যাতন আর খুনের পরিসংখ্যানকে এনসিআরবি রিপোর্টের শীর্ষে নিয়ে গিয়েছে, তারা কোন নৈতিক সাহসে বাংলার আইনশৃঙ্খলার দোহাই দেয়?
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজতাত্ত্বিক ক্রিস্তফ জেফ্রেলো তাঁর ‘গুজরাত আন্ডার মোদি: দ্য ব্লুপ্রিন্ট ফর টুডে’জ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে মোদি-মডেলের এক হাড়হিম করা ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ‘ভাইব্র্যান্ট গুজরাত’-এর চাকচিক্যের আড়ালে কীভাবে এক নিষ্ঠুর কর্পোরেট তোষণকারী অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়েছিল। এই মডেলের মূল স্তম্ভই হলো বৃহৎ শিল্পপতিদের হাতে সরকারি ভাণ্ডার অবারিত করে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণমূলক খাতের বরাদ্দ ক্রমাগত সংকুচিত করা। যার অনিবার্য ফল— বিপুল হারে ছাঁটাই এবং মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সম্পদের পাহাড় তৈরি হওয়া। আজ কেন্দ্রীয় সরকার যে ১০০ দিনের কাজের টাকা বা ‘মনরেগা’ প্রকল্প বন্ধ করে দিচ্ছে, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বরাদ্দ ছাঁটাই করছে, তার মহড়া কিন্তু সেই গুজরাতেই হয়েছিল। আরএসআই-এর তথ্য বলছে, ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয়ের নিরিখে গুজরাত ছিল ভারতের তলানিতে। এই মডেলের উদ্দেশ্যই হলো এক ‘পুলিশ স্টেট’ তৈরি করা, যেখানে বঞ্চনার শিকার প্রান্তিক মানুষ— কৃষক, দলিত বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের কণ্ঠস্বর হারাবে।
বিজেপির এবারের ইস্তাহারে মহিলাদের জন্য যে লক্ষ্মীলাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি নিছকই নির্বাচনী কৌশল। মহারাষ্ট্রে ‘লাড়কি বহেন’ প্রকল্প চালুর পরেই কৌশলে ৮৭ লক্ষ মহিলার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দিল্লিতেও ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে ২৫০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল মোদিজির, যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বিহারে তো এক কদম এগিয়ে— ভোটের আগে অনুদান দিয়ে ভোটের পর তা ফেরত চেয়ে বুলডোজার পাঠানোর হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে ডাবল ইঞ্জিন সরকার। কাজেই বাংলার মেয়েরা এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে ভুলবেন, এমন ভাবাটা বালখিল্যতা।
নারী নিরাপত্তার দাবি তো আরও হাস্যকর। খোদ কেন্দ্রীয় সংস্থা এনসিআরবি-র পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, নারী নিগ্রহ, নাবালিকা পাচার এবং ঘরোয়া হিংসায় শীর্ষস্থানগুলো দখল করে রেখেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো। আর কর্মসংস্থান? স্বাধীনতার ৪৫ বছরের ইতিহাসে ভারত আজ সর্বোচ্চ বেকারত্বের সম্মুখীন। সাড়ে ন’লক্ষ কেন্দ্রীয় পদ শূন্য পড়ে থাকা সত্ত্বেও অস্থায়ী কর্মী দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। সিন্ডিকেট আর কাটমানির কথা যারা বলছেন, তাদের শাসিত রাজ্যগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় এক সংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। মধ্যপ্রদেশের ভুয়া অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা তছরুপ থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশের ৬৯ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্যানেল বাতিলের ইতিহাস এখনও টাটকা।
ত্রিপুরার উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে এক জীবন্ত দুঃস্বপ্ন। ১০৩২৩ জন শিক্ষকের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে বিজেপি আজ তাঁদের পথের ভিখারি বানিয়েছে। অনাহারে-অসুস্থতায় ২৩০ জন শিক্ষকের অকালমৃত্যু আর বাকিদের ডেলিভারি বয় বা অটোচালকের পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়া— এটাই কি ‘সুশাসন’? উগ্র সাম্প্রদায়িকতা আর সন্ত্রাসের যে বধ্যভূমিতে আজ ত্রিপুরা পরিণত হয়েছে, সেই একই ছক কি তারা বাংলার জন্য নিয়ে আসছে?
অতএব, ইস্তাহারের চাকচিক্য দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার সময় আর নেই। অতীতের ‘১৫ লক্ষ টাকা অ্যাকাউন্টে ঢোকা’ বা ‘বছরে দু’কোটি চাকরি’র মতোই এই সংকল্পপত্রও যে আর একটি বড় মাপের ‘জুমলা’, তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজের কথাতেই প্রমাণিত। বাংলার মানুষ কি এই মিথ্যার কারবারিদের বিশ্বাস করবে, নাকি বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার বুঝে নেবে— ইতিহাস এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

