AB Live News
ভাতার শৃঙ্খল বনাম কর্মসংস্থানের হাহাকার: উন্নয়নের আড়ালে পরিযায়ী বাংলা

শিবনাথ দাস: মুড়িগঙ্গা নদীর শান্ত স্রোতে যখন পরিযায়ী পাখিরা ভেসেলের পিছু নেয়, তখন সেই দৃশ্য পর্যটকের চোখে মনোরম হতে পারে, কিন্তু এক জন শিক্ষিত বেকারের চোখে তা এক নিষ্ঠুর রূপক। পাখিরা খাবারের খোঁজে ভেসেল থেকে ছুড়ে দেওয়া টুকরোয় ভাগ বসায়; ঠিক যেমনটা এ রাজ্যের বর্তমান শাসকদল তৃণমূল বাংলার সাধারণ মানুষকে সরকারি দাক্ষিণ্যের ‘ভাতা’র ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে চেয়েছে। কিন্তু পাখির উড্ডয়ন আর মানুষের পলায়ন এক নয়। শেখ খোকনের মতো একজন দক্ষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার যখন নিজের সাগরের ভিটে ছেড়ে পেটের দায়ে গুয়াহাটির নির্মাণস্থলে দিন গুজরান করেন, তখন প্রমাণিত হয়—তৃণমূলের তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ আসলে একটি কঙ্কালসার কাঠামো, যা কেবল বিজ্ঞাপনের মোড়কে ঢাকা।
তৃণমূল জমানার গত দেড় দশকের শাসনে পশ্চিমবঙ্গ আজ এক অদ্ভুত সংকটের মুখে। একদিকে নবান্ন থেকে প্রতিনিয়ত ‘বিশ্ববাংলা’ আর শিল্পায়নের ঢক্কানিনাদ শোনা যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতি বছর কয়েক লক্ষ শিক্ষিত ও অদক্ষ শ্রমিক স্রেফ দু-মুঠো অন্নের সংস্থানে ভিনরাজ্যের ট্রেনে সওয়ার হচ্ছেন। শেখ খোকনের প্রশ্নটি আজ বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে: “ভাতা দিয়ে কী উন্নতি হয়?” এই প্রশ্নটি আসলে বর্তমান সরকারের দেউলিয়া অর্থনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধেই এক চূড়ান্ত প্রতিবাদ। লক্ষ্মীর ভান্ডার বা যুবশ্রী প্রকল্পের মতো খয়রাতি প্রকল্পগুলো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কখনওই একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর ভিত্তি হতে পারে না।
শাসকদল সুকৌশলে কর্মসংস্থানের দাবিকে ‘ডোল পলিটিক্স’ বা ভাতার আড়ালে চাপা দিতে চাইছে। উন্নয়নের সংজ্ঞা আজ বদলে দেওয়া হয়েছে—রাস্তা বা কালভার্ট নয়, বরং কত বেশি মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে সরকারি অনুদান দেওয়া গেল, সেটাই এখন সাফল্যের মাপকাঠি। অথচ সাগরের মতো পর্যটন সম্ভাবনাপূর্ণ এলাকায় যেখানে কয়েক হাজার স্থানীয় যুবকের স্থায়ী রোজগারের ব্যবস্থা হতে পারত, সেখানে আজ শ্মশানের নীরবতা। শিল্পহীন বঙ্গে বড় কারখানা আসা তো অলীক কল্পনা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্পগুলোও আজ তোলাবাজি আর সিন্ডিকেট রাজের জাঁতাকলে পিষ্ট। ফলে মেধা আর শ্রমের এই রক্তক্ষরণ বা ‘ব্রেন ড্রেন’ আজ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরকে পুরুষশূন্য করে দিচ্ছে।
সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো নিয়োগ দুর্নীতির পাহাড়। একদিকে সরকারি দপ্তরের হাজার হাজার শূন্যপদ বছরের পর বছর ফাঁকা পড়ে আছে, অন্যদিকে যোগ্য প্রার্থীরা ন্যায্য চাকরির দাবিতে কলকাতার রাজপথে মাসের পর মাস রোদে পুড়ে, জলে ভিজে চোখের জল ফেলছেন। এই সরকার যুবশক্তিকে স্বাবলম্বী করার বদলে তাঁদের ভিক্ষুক করে রাখতে বেশি আগ্রহী, যাতে ভোটের আগে কয়েকশ টাকার বিনিময়ে তাঁদের আনুগত্য কেনা যায়। খোকনের মতো একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের হৃদয়ের হাহাকার আসলে সেই ছিন্নভিন্ন স্বপ্নের দলিল, যা এই সরকার প্রতিদিন সাধারণ মানুষের চোখে এঁকে চলেছে।
পরিবার ভাঙছে, বৃদ্ধ বাবা-মা একা হয়ে পড়ছেন, আর বাংলার তেজদীপ্ত যুবসমাজ ব্যাঙ্গালুরু, দিল্লি কিংবা গুয়াহাটির অলিগলিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিচ্ছে। ভাতার প্রলেপ দিয়ে পরিযায়ী যন্ত্রণার এই গভীর ক্ষত ঢাকা দেওয়া অসম্ভব। পাখিরা খাবার পেলে ওড়ে, কিন্তু মানুষ যখন দেশান্তরী হয়, তখন বুঝতে হবে সেই মাটির শাসনব্যবস্থা পচনশীল। সাগরের ঢেউয়ের গর্জনের মতো আজ গোটা পশ্চিমবঙ্গের যুবসমাজ চিৎকার করে বলছে— “আমাদের করুণার দান নয়, সম্মানের কাজ দাও।” যতদিন না এই সরকার খয়রাতির রাজনীতি ছেড়ে প্রকৃত কর্মসংস্থান আর শিল্পের পথে হাঁটবে, ততদিন মুড়িগঙ্গার পাড়ে শেখ খোকনদের দীর্ঘশ্বাস এই জমানার ব্যর্থতার দলিল হিসেবেই থেকে যাবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

