AB Live News
ওয়েব সিরিজে যৌনতার ঝোঁক গবেষণায় উঠে এল চাঞ্চল্যকর কারণ
রুচিরা রায়: ডিজিটাল যুগের এই ছুটোছুটিতে ওয়েব সিরিজগুলো যেন যৌন সুড়সুড়ির খেলায় মত্ত। খুনোখুনি থেকে অবাধ যৌনতা—সবকিছু দেখিয়ে দর্শকের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। কিন্তু এই প্রবণতার পিছনে কী লুকিয়ে আছে? এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় কলেজপড়ুয়া ৩০০ ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে যা উঠে এল, তা চাঞ্চল্যকর। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত ‘অশ্লীল’ কনটেন্টের প্রতি এই আকর্ষণ মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে—মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি থেকে সম্পর্কের জটিলতা পর্যন্ত।
ইন্টারনেটের এই অফুরন্ত জগতে কনটেন্টের বন্যা। ওয়েব সিরিজ, সিনেমা ছাড়াও ভ্লগ, রিলস—সবকিছুতে জীবনের রোজনামচা থেকে বিলাসিতার ঝলক। কিন্তু জনপ্রিয়তার দৌড়ে অনেকেই যৌনতাকে ‘হট’ কনটেন্ট হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। ফলে, অল্প সময়ে লক্ষ লক্ষ ভিউ। বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই ধরনের সিরিজগুলোর দর্শকের সংখ্যা অসাধারণ। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক কয়েকটি সিরিজে যৌন দৃশ্যের পর ভিউ ৩০০ শতাংশ বেড়েছে বলে প্ল্যাটফর্মের ডেটা বলছে।
তবে এই ‘অশ্লীল’ ছড়াছড়ির বিরুদ্ধে সরকারও সতর্ক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ১৮টি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ১৯টি ওয়েবসাইট এবং ১০টি অ্যাপকে নিষ্ক্রিয় করেছে। মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “কুৎসিত কনটেন্টের ছড়ানো সমাজের নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।” কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—কেনই বা এই ঝোঁক ক্রমশ বাড়ছে? উত্তর খুঁজতে গবেষকরা হাত বাড়িয়েছেন তরুণ প্রজন্মের দিকে।
আন্তর্জাতিক এক রিসার্চ টিম কমপক্ষে ৩০০ কলেজপড়ুয়াকে নিয়ে বিস্তারিত জরিপ করেছে। এরা সবাই ১৮-২২ বছর বয়সী, যারা সদ্য বয়ঃসন্ধিকাল পেরিয়ে এসেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে পাঁচটি মূল কারণ, যা যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া কনটেন্টের প্রতি আকর্ষণকে ব্যাখ্যা করে। প্রথমত, অভ্যাসের ফাঁদ। অনেকেই প্রথমে কৌতূহল থেকে এই কনটেন্ট দেখতে শুরু করেন, কিন্তু দেখতে দেখতে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। গবেষকরা বলছেন, “এটি ডোপামিনের খেলা—প্রতিবার দেখলে মস্তিষ্কে ‘পুরস্কার’ অনুভূতি জাগে, যা আসক্তির দিকে নিয়ে যায়।” এটি নীল ছবির যুগের মতোই, যেখানে কৌতূহল থেকে শুরু হয়ে আসক্তি হয়ে উঠত।
দ্বিতীয় কারণ, পুরুষদের ‘শিক্ষামূলক’ দৃষ্টিভঙ্গি। গবেষণায় দেখা গেছে, সিরিজের সিংহভাগ দর্শক পুরুষ। তারা এই কনটেন্টকে যৌনতা সম্পর্কে ‘লার্নিং টুল’ মনে করেন। “সিনেমার মতো করে সঙ্গিনীকে তৃপ্ত করলে সম্পর্ক রোমাঞ্চকর হবে,”—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে। মনোবিজ্ঞানী ড. রাহুল শর্মা বলছেন, “এটি একটি ভুল ধারণা। বাস্তবে এই কনটেন্ট অবাস্তব যৌনতা দেখায়, যা সম্পর্কে হতাশা তৈরি করে।” ফলে, পুরুষদের মধ্যে এই ঝোঁক ৭০ শতাংশেরও বেশি।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত যৌন আকাঙ্ক্ষা। কেউ কেউ সরাসরি তৃপ্তির জন্য এই কনটেন্টের আশ্রয় নেন। গবেষণায় ৪৫ শতাংশ ছাত্র স্বীকার করেছেন, এটি তাদের ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণ করে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, “এটি অস্থায়ী তৃপ্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ বাড়ায়, বিশেষ করে একাকীত্বের অনুভূতি জাগায়।”
চতুর্থ কারণ, সামাজিক চাপ ও বন্ধুদের প্রভাব। কলেজের তরুণরা যৌনতাকে রহস্যময় মনে করেন। বন্ধুবান্ধবের মধ্যে আলোচনা হলে অনেকে ‘পাল্লায় পড়ে’ এই কনটেন্ট দেখতে শুরু করেন। গবেষণায় ৩৫ শতাংশ বলেছে, “বন্ধুরা শেয়ার করলে দেখতে হয়েছে।” ফলে, গুণগত মান খারাপ হলেও যৌনতার নামে ভিউ বাড়ছে।
পঞ্চম কারণটি আরও গভীর—ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি। স্মার্টফোনের যুগে যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় কনটেন্ট পাওয়া যায়। গবেষকরা বলছেন, “অ্যালগরিদমগুলো এই ধরনের কনটেন্টকে প্রমোট করে, যা আকর্ষণ বাড়ায়।” এটি তরুণদের মধ্যে একটি চক্র তৈরি করে, যেখানে দেখা থেকে শেয়ার করা পর্যন্ত সবকিছু সহজ হয়ে যায়।
এই প্রবণতা কেবল বিনোদন নয়, স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও। সেক্সোলজিস্ট ড. প্রিয়া মেনন বলছেন, “অতিরিক্ত এক্সপোজার যৌন আসক্তি, সম্পর্কের অস্থিরতা এবং এমনকি ডিপ্রেশন ডেকে আনতে পারে। তরুণরা বাস্তব যৌনতার পরিবর্তে অবাস্তব ছবির ফাঁদে পড়ছেন।” গবেষণাটি সুপারিশ করেছে, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। প্ল্যাটফর্মগুলোতেও কনটেন্ট রেগুলেশন শক্ত করতে হবে।
ডিজিটাল বিনোদনের এই নতুন মোড়ে তরুণরা কি সতর্ক হবেন? নাকি এই ঝোঁক আরও বাড়বে? সময়ই বলবে। তবে একটা কথা স্পষ্ট—যৌনতা বিনোদনের সরঞ্জাম নয়, এটি সম্পর্কের সুন্দর অংশ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

