AB Live News
ইবোলার থাবা: ভারতে কড়া সতর্কতা
মধ্য আফ্রিকায় মারণ ভাইরাস ইবোলার নতুন স্ট্রেনের তাণ্ডবে অন্তত ১২০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কঙ্গো এবং উগান্ডায় এই ভাইরাসের সংক্রমণে ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে কয়েকশো। এই পরিস্থিতিতে ভারতে এখনও পর্যন্ত কোনও আক্রান্তের হদিস না মিললেও, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে বিন্দুমাত্র ঝুঁকি না নিয়ে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হল। দেশের প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সমুদ্রবন্দরে বহিরাগত যাত্রীদের ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক। বিশেষ করে আফ্রিকা মহাদেশ বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিহ্নিত সংক্রামিত এলাকা থেকে আসা প্রতিটি যাত্রীর থার্মাল স্ক্যানিং এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হল। কোনও যাত্রীর শরীরে সামান্যতম উপসর্গ বা সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা গেলেই তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তরিত করার সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দেশে এই মারণ ভাইরাসের প্রবেশ রুখতে ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক সম্পন্ন হল। ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (NCDC), ইন্টিগ্রেটেড ডিজিজ সার্ভেইল্যান্স প্রোগ্রাম (IDSP) এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR)-এর মতো দেশের শীর্ষ সারির চিকিৎসা গবেষণা ও নজরদারি সংস্থাগুলির উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রকের শীর্ষ কর্তারা। সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি তাদের রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য দেশের একাধিক সরকারি পরীক্ষাগার ও ল্যাবরেটরিকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হল। চিকিৎসকদের একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্সও গঠন করা হল যা সার্বিক পরিস্থিতির ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখবে। তবে সরকার ও স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকে বারবার দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে যে, এই মুহূর্তে ভারতে ভয়ের কোনও কারণ নেই, কারণ দেশে এখনও কোনও ইবোলা আক্রান্তের সন্ধান মেলেনি। তবে এই পরিস্থিতিতে যাতে কোনওভাবেই সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনও মাধ্যমে ভুয়ো খবর বা গুজব না ছড়ায়, তার জন্য কড়া প্রশাসনিক বার্তা দেওয়া হল। সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রের আর্জি, আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি না করে রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তরফ থেকে ইতিমধ্যেই এই ভাইরাসের আকস্মিক প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এবার যে ভাইরাসটির কারণে ইবোলা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা অত্যন্ত বিরল এবং মারাত্মক প্রকৃতির। এই বিশেষ স্ট্রেনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বুন্দিবুগিও ভাইরাস’। সাধারণ ইবোলার তুলনায় এটি আরও বেশি বিপজ্জনক কারণ এখনও পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনও অনুমোদিত চিকিৎসা পদ্ধতি, প্রতিষেধক বা টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। এর ভয়াবহতা এতটাই বেশি যে, সংক্রমণ তীব্র হলে আক্রান্ত হওয়ার মাত্র ৩ দিনের মধ্যেই রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিগত ৫০ বছরের চিকিৎসা ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইবোলা রোগে মৃত্যুর হার ২৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারত, যা একে পৃথিবীর অন্যতম মারণ রোগে পরিণত করেছে। এই ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকার মেয়াদ সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত হতে পারে, যা এর প্রাথমিক সনাক্তকরণকে চিকিৎসকদের কাছে অত্যন্ত জটিল করে তোলে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মারণ ভাইরাসের মূল উৎস এক বিশেষ প্রজাতির বাদুড় বলে ধারণা করা হলেও, মানুষের শরীরে এটি অত্যন্ত দ্রুত এবং মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে, হাঁচি-কাশির মাধ্যমে কিংবা চোখ, নাক, মুখ ও চামড়ার কোনও ক্ষতস্থান দিয়ে এই ভাইরাস সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া রোগীর বমি, রক্ত, লালা বা বীর্যের মতো যে কোনও शारीरिक তরলের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ ছড়ানোর গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই রোগে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে তীব্র জ্বর, ডায়েরিয়া, বমিভাব এবং চরম শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। পরবর্তী পর্যায়ে রোগীর শরীরের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অংশে তীব্র রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি দ্রুত তাদের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। সংক্রামিত কোনও প্রাণীর মাংস সঠিকভাবে রান্না না করে খেলেও এই রোগ ছড়াত, তাই এই বিষয়েও বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জানা গিয়েছে যে, বুন্দিবুগিও ভাইরাসের এই ধরনের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব মানব ইতিহাসে এই নিয়ে মাত্র তৃতীয়বার দেখা গেল। এর আগের দুটি সংক্রমণের ঘটনাও মূলত আফ্রিকার কঙ্গো এবং উগান্ডাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আক্রান্ত মানুষের সঠিক সংখ্যা ঠিক কত এবং ভৌগোলিক দিক থেকে এই রোগ আফ্রিকার কতদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারছে না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সংক্রমণ ছড়ানোর গতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এই চরম অনিশ্চয়তার কারণেই ভারত সরকার বহিরাগত সমস্ত প্রবেশদ্বারে আগাম সুরক্ষাপ্রাচীর গড়ে তুলতে তৎপর হয়েছে। সমুদ্রবন্দরগুলিতেও জাহাজের নাবিক ও যাত্রীদের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে যাতে জলপথেও এই ভাইরাসের কোনও অনুপ্রবেশ না ঘটে। দেশের প্রধান প্রধান হাসপাতালগুলিতে বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হল যাতে যে কোনও জরুরি পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

