Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

চিন্তা করবেন না, ভাইপোবাবুর লিস্ট আসছে

0 218,975,489

 বাংলার রাজনীতির মঞ্চে যেন নতুন এক ‘রিয়েল এস্টেট মহাভারত’-এর সূচনা হল। এতদিন যাঁকে বিরোধীরা ‘ভাইপোবাবু’ বলে খোঁচা দিত, এবার তাঁর সম্পত্তির খতিয়ান নিয়েই সরাসরি রাজনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ফলতার জনসভা শনিবার বিকেলে মুহূর্তে যেন নির্বাচনী প্রচারের সভা থেকে বদলে গেল সম্পত্তির অডিট অফিসে। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শুভেন্দুর গলায় তখন বিজয়ীর আত্মবিশ্বাস, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি, আর ভাষণে এমন এক ব্যঙ্গের ঝাঁঝ, যা শুনে সভার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিজেপি কর্মীদের হাততালি ও হো হো হাসিতে বারবার থমকে যাচ্ছিল বক্তৃতা।

মুখ্যমন্ত্রী বললেন, “চিরকাল কাহারো সমান নাহি যায়। ভাইপোবাবু তৈরি থাকুন। লিস্ট আনা হচ্ছে। কলকাতা কর্পোরেশন থেকে কালই কাগজ আনালাম। লিপস অ্যান্ড বাউন্ডসের ২৪টা প্রপার্টি! ২৪টা! এ যেন ব্যবসা না, একেবারে রামায়ণের সোনার লঙ্কা!”

সভামঞ্চে তখন হাসির রোল। বিজেপি কর্মীদের একাংশ চিৎকার করে ওঠেন, “আরও আছে! আরও আছে!” শুভেন্দুও যেন সেই সুরেই এগোলেন। তাঁর কথায়, “আমতলায় প্রাসাদের মতো অফিস! বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে পাঁচতারা রিসর্ট, ভিতরে গেলে বোঝা যায় এটাই বাংলার নতুন আলাদিনের গুহা! এত সম্পত্তি কীভাবে হল, কার টাকায় হল, কোন জাদুর কাঠিতে হল—সব হিসাব হবে।”

রাজ্যের রাজনীতিতে বহুদিন ধরেই ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ নামটি বিরোধীদের আক্রমণের কেন্দ্রে। বিজেপির অভিযোগ, এই সংস্থার আড়ালেই বছরের পর বছর ধরে ‘প্রভাবের সাম্রাজ্য’ তৈরি হয়েছে। তবে এতদিন অভিযোগ ছিল কাগজে-কলমে। এবার মুখ্যমন্ত্রীর গলায় যে সুর শোনা গেল, তাতে স্পষ্ট—সরকারি স্তরেই নথি টেনে এনে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক লড়াই শুরু করতে চাইছে নবান্ন।

শুভেন্দু এদিন নাম না করলেও তাঁর প্রতিটি বাক্য যে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করেই, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয়নি। বক্তৃতার মাঝেই তিনি বলেন, “এতদিন বাংলার মানুষ ভাবত চাকরি নেই, শিল্প নেই, ব্যবসা নেই। এখন দেখছি ব্যবসা ছিল, তবে সেটা সবার জন্য ছিল না। এক পরিবারের জন্য ছিল। সাধারণ মানুষ ইএমআই দেয়, আর কেউ কেউ কলকাতাজুড়ে প্রপার্টি কেনে। এও এক ধরনের স্টার্টআপ সংস্কৃতি!”

জনতার মধ্যে তখন হাসির বিস্ফোরণ। সভার পিছন দিক থেকে কেউ চিৎকার করে ওঠেন, “স্টার্টআপ বাংলা!” সঙ্গে সঙ্গে শুভেন্দু জবাব দেন, “হ্যাঁ, স্টার্টআপ বাংলা! তবে ইনভেস্টমেন্ট জনগণের, প্রফিট পরিবারের!”

রাজনৈতিক মহলের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই আক্রমণ নিছক নির্বাচনী ভাষণ নয়। এর মধ্যে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। আর জি কর-কাণ্ডের তদন্তে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে চাপ বাড়ানোর পর এবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও সরাসরি নিশানায় আনছে নতুন সরকার। বিজেপির অন্দরে অনেকেই বলছেন, “আগে ছিল কাটমানির বিরুদ্ধে লড়াই, এখন হচ্ছে প্রপার্টিম্যানির বিরুদ্ধে লড়াই।”

শুভেন্দু এদিন আরও বলেন, “বাংলার মানুষ এতদিন ভেবেছিল নেতারা শুধু বক্তৃতা দেন। এখন মানুষ জানছে, বক্তৃতার পাশাপাশি কেউ কেউ বিল্ডিংও দেন! একেকটা অফিস দেখলে মনে হয় সিনেমার সেট। বাংলার গরিব মানুষের ঘরে ছাদ ফুটো, আর কারও অফিসে ইতালিয়ান মার্বেল!”

তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ‘হিসাব হবে’ শব্দবন্ধ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই শব্দই এখন বিজেপির নতুন রাজনৈতিক স্লোগান হতে চলেছে। একসময় ‘খেলা হবে’ ছিল তৃণমূলের অস্ত্র। এখন শুভেন্দুর গলায় শোনা যাচ্ছে, “হিসাব হবে।”

ফলতার সভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “যারা ভাবত ক্ষমতা চিরস্থায়ী, তারা ইতিহাস পড়েনি। বাংলার মানুষ কাউকে স্থায়ী বন্দোবস্ত দেয় না। আজ যারা ভাবছেন সব কাগজ চাপা পড়ে থাকবে, তারা ভুল করছেন। কলকাতা কর্পোরেশনের ফাইল খুলছে। জমির দলিল বেরোচ্ছে। ট্যাক্স রেকর্ড দেখা হচ্ছে। এবার বাংলার মানুষ জানবে কারা কত বড় জমিদার।”

রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বেশি চর্চা হচ্ছে শুভেন্দুর “২৪টি প্রপার্টি” মন্তব্য নিয়ে। যদিও সরকারিভাবে এখনও কোনও নথি প্রকাশ হয়নি, তবু বিজেপি শিবিরে দাবি, কলকাতা ও শহরতলির একাধিক সম্পত্তির তথ্য ইতিমধ্যেই সংগ্রহ করা হয়েছে। বিরোধীদের কটাক্ষ, “যে বাংলায় সাধারণ মানুষ একটা ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্ট জোগাড় করতে হাঁসফাঁস করে, সেখানে কেউ যদি ২৪টি সম্পত্তির মালিক হন, তবে তাঁকে নিয়ে কৌতূহল হবেই।”

তৃণমূল অবশ্য এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলেই উড়িয়ে দিয়েছে। দলের এক নেতা বলেন, “এটা প্রশাসন নয়, প্রতিহিংসার সরকার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে এভাবে সম্পত্তির কথা বলা হচ্ছে।” যদিও বিজেপি পাল্টা বলছে, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সব বৈধ হলে ভয় কিসের?”

সভায় শুভেন্দুর শরীরী ভাষাও ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। কখনও তিনি হাত নেড়ে জনতাকে উসকে দিচ্ছেন, কখনও আবার মুচকি হেসে বলছেন, “লিস্ট তো শুরু হয়েছে মাত্র!” এই একটি বাক্যেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা আরও বেড়েছে। তবে কি আগামী দিনে আরও বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে আসতে চলেছে?

বিজেপি সূত্রে খবর, শুধুমাত্র কলকাতা নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও শহরতলির কয়েকটি সম্পত্তিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিরোধীরা অবশ্য বলছেন, “রাজনীতি এখন তদন্ত সংস্থার প্রেস কনফারেন্সে নেমে এসেছে।”

ফলতার সভা শেষ হওয়ার পরেও জনতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চর্চা ছিল ‘লিস্ট’ নিয়েই। কেউ বলছেন “এবার বুঝি সিরিয়াল বেরোবে”, কেউ বলছেন “নতুন ওয়েব সিরিজের নাম—লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস ফাইলস!” এক যুবককে বলতে শোনা গেল, “আগে শুনতাম ল্যান্ড রিফর্ম, এখন শুনছি ল্যান্ড রিপোর্ট!”

বাংলার রাজনীতিতে ব্যঙ্গ, কটাক্ষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ নতুন নয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর এই সুর স্পষ্ট করে দিল—আগামী দিনে রাজনীতির কেন্দ্রে থাকবে শুধুই মতাদর্শ নয়, সম্পত্তির হিসাবও। আর সেই হিসাবের খাতায় ‘ভাইপোবাবু’ নামটি যে বড় অক্ষরে লেখা হয়ে গিয়েছে, তা শনিবারের ফলতার সভা বুঝিয়ে দিল স্পষ্টভাবেই।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper