AB Live News
ভোজশালা মন্দিরই, রায় হাইকোর্টের
মধ্যপ্রদেশের ধার শহরের ঐতিহাসিক তথা দীর্ঘকালীন বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা ভোজশালা চত্বর নিয়ে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক রায়দান করল মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। ভোজশালার বিতর্কিত অংশটি আসলে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির, শুক্রবার এই মর্মেই সিলমোহর দিল আদালত। হাইকোর্টের বিচারপতি বিজয়কুমার শুক্ল এবং বিচারপতি অলোক অবস্থীর ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, সংগৃহীত নানা ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ এবং বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বিশ্লেষণ করে এটি প্রমাণিত যে এই স্থানে হিন্দু উপাসনার ধারাবাহিকতা কোনোদিনই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। এর পাশাপাশি আদালত মুসলিম পক্ষকে অন্য কোনও উপযুক্ত স্থানে উপাসনা বা নামাজ পাঠ করার পরামর্শ দিয়েছে এবং উপাসনার সুবিধার্থে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে একটি ভিন্ন বিকল্প স্থান চেয়ে নেওয়ার জন্য মুসলিম আবেদনকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আদালতের এই রায়ের ফলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আইনি ও সামাজিক বিতর্কের অবসান ঘটতে চলেছে বলে মনে করছে দেশের ওয়াকিবহাল মহল।
ধার শহরে অবস্থিত প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন কামাল মওলানার দরগা এবং সংলগ্ন মসজিদ চত্বরটি নিয়ে হিন্দু ও মুসলিম— দুই পক্ষের মধ্যেই দীর্ঘ দিন ধরে বিবাদ চলছিল। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, এই সৌধটি আসলে একাদশ শতকে পারমার রাজবংশের প্রখ্যাত রাজা ভোজের দ্বারা নির্মিত একটি পবিত্র ও প্রাচীন সরস্বতী মন্দির। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিবাদের মীমাংসা করতে বিগত দিনে একটি অন্তর্বর্তী সরকারি নিয়ম বলবৎ ছিল। সেই নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার হিন্দুদের এই ভোজশালা চত্বরে পুজো ও আরাধনা করার অনুমতি দেওয়া হত, অন্যদিকে প্রতি শুক্রবার মুসলিম সম্প্রদায়কে সেখানে জুমার নামাজ পড়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। সপ্তাহের বাকি দিনগুলিতে সাধারণ পর্যটক বা দর্শনার্থীদের প্রবেশের অধিকার থাকলেও কাউকে কোনও প্রকার ধর্মীয় আচার বা উপাসনা করতে দেওয়া হত না। এই দ্বৈত অধিকারের নিয়মে ইতি টেনে এবং সেখানে একচ্ছত্রভাবে হিন্দু উপাসনার রীতিকে স্থায়ীভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার আর্জি জানিয়ে ২০২২ সালে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল একাধিক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন।
মামলার গুরুত্ব বিচার করে এবং সত্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট ইতিপূর্বে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা এএসআই-কে বিতর্কিত অংশটিতে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ‘বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ বা সায়েন্টিফিক সার্ভে চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল। আদালতের সেই নির্দেশিকা মেনে এএসআই-এর আধিকারিক ও বিশেষজ্ঞরা টানা ৯৮ দিন ধরে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ওই চত্বরে নিবিড় অনুসন্ধান চালান। দীর্ঘ সমীক্ষার পর কেন্দ্রীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের তরফে আদালতে প্রায় দু’হাজার পাতার একটি অত্যন্ত বিশদ ও প্রযুক্তিগত রিপোর্ট পেশ করা হয়। সেই রিপোর্টে এএসআই অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেছিল যে, বর্তমানে যেখানে মসজিদ কাঠামোটি অবস্থান করছে, তার ঠিক নিচেই প্রাচীন পারমার রাজবংশের আমলে তৈরি একটি বিশাল ও সমৃদ্ধ ধর্মীয় কাঠামোর অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। যদিও মুসলিম পক্ষের মামলাকারীরা এই সমীক্ষাকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিহিত করে আদালতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল এবং তা নিয়ে আইনি আঙিনায় বিস্তর জলঘোলাও হয়েছিল।
তবে সমস্ত আপত্তি ও বিতর্ককে খারিজ করে দিয়ে শুক্রবার মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ এএসআই-এর বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট এবং প্রাচীন ঐতিহাসিক নথির ওপরই পূর্ণ আস্থা রাখল। আদালত তার রায়ে স্পষ্ট করে জানায়, ঐতিহাসিক প্রাচীন সাহিত্য ও উপাদানও অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে বিতর্কিত এই এলাকাটি আসলে রাজা ভোজের প্রতিষ্ঠিত একটি বিখ্যাত সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র ও মন্দির ছিল। তাই এই সমগ্র বিতর্কিত অংশটিকে এখন থেকে আইনিভাবে মন্দির হিসেবেই ঘোষণা করা হচ্ছে। এই রায় দেওয়ার পাশাপাশি বিচারপতিরা এই ঐতিহাসিক সৌধের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও কড়া নির্দেশিকা জারি করেছেন। আদালত জানিয়েছে, সামগ্রিক ভোজশালা চত্বরের সংরক্ষণ, প্রাচীন স্থাপত্যের সুরক্ষা এবং পরিকাঠামোর যাবতীয় তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থাকবে সম্পূর্ণভাবে এএসআই-এর হাতে এবং এই বিষয়ে তাদেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।
আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ের পর হিন্দু পক্ষের দীর্ঘদিনের আরেকটি বড় দাবি পূরণের পথও প্রশস্ত হল বলে মনে করা হচ্ছে। হিন্দু পক্ষের আবেদনকারীদের দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ ইচ্ছা এবং দাবি ছিল, বর্তমানে লন্ডনের জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকা প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাগদেবী বা মা সরস্বতীর প্রতিমাটি আন্তর্জাতিক স্তরে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় ভারতে ফিরিয়ে এনে এই ভোজশালা চত্বরে মহাসমারোহে স্থাপন করা হোক। এই বিষয়ে ইতিপূর্বেই কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকগুলির কাছে একাধিক আবেদন ও স্মারকলিপি জমা পড়েছে। শুক্রবার মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট এই প্রসঙ্গেও এক ইতিবাচক মন্তব্য করে জানিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে আগামী দিনে সেই সমস্ত আবেদন ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াগুলি অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করে দেখতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই এই রায়ের পর ধার শহর তথা সমগ্র মধ্যপ্রদেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপক জোরদার করা হয়েছে এবং এই রায়কে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

