AB Live News
ঝালমুড়ি-বিবাদে তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের উত্তপ্ত আবহে এবার রাজনীতির ময়দানে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল এক ঠোঙা ‘ঝালমুড়ি’। সৌজন্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবারের ঝাড়গ্রামে প্রধানমন্ত্রীর ঝালমুড়ি খাওয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার বীরভূমের মুরারইয়ের সভা থেকে সেই ঘটনাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানালেন তৃণমূল নেত্রী। মোদীর এই জনসংযোগকে ‘পুরোপুরি সাজানো নাটক’ বলে অভিহিত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, যাঁর পকেটে কোনোদিন ১০ টাকা থাকে না, তাঁর জন্য দোকানে আগেভাগে ক্যামেরা ফিট করা হল কী করে?
ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার। ঝাড়গ্রামে নির্বাচনী জনসভা শেষ করে হেলিপ্যাডের দিকে যাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আচমকাই রাজ কলেজ মোড়ের কাছে রাজপথ ছেড়ে তাঁর কনভয় দাঁড়িয়ে পড়ে একটি অতি সাধারণ রাস্তার ধারের ঝালমুড়ির দোকানের সামনে। নিরাপত্তারক্ষীদের কপালে ভাঁজ ফেলে প্রধানমন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে সটান পৌঁছে যান সেই দোকানে। সাধারণ মানুষের ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে অর্ডার দেন ১০ টাকার ঝালমুড়ির। দোকানি যখন ঝালমুড়ি মাখছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রীকে তিনি প্রশ্ন করেন, “আপনি কি পেঁয়াজ খান?” সহাস্য মুখে মোদীর তাৎক্ষণিক জবাব ছিল, “পেঁয়াজ তো খাই, কিন্তু কারও মাথা খাই না।” প্রধানমন্ত্রীর এই রসিকতা এবং অতি সাধারণের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে মুড়ি খাওয়ার ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। বিরোধী শিবির এই ঘটনাকে ‘জনসংযোগের মাস্টারস্ট্রোক’ বলে দাবি করলেও, সোমবার তার পাল্টা দিতে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বীরভূমের জনসভায় দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই ‘মুড়ি-বিলাস’ নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “সবটাই আগে থেকে ঠিক করা চিত্রনাট্য। ১০ টাকা কি কখনও ওঁর পকেটে থাকে? উনি তো বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে ওঁর কোনো যোগ নেই। ঝালমুড়িও নাকি ওরাই তৈরি করে রেখেছিল। আমার প্রশ্ন হল, যদি আচমকাই দোকানে ঢোকেন, তবে সেখানে আগে থেকে প্রফেশনাল ক্যামেরা ফিট করা থাকল কী করে? আসলে মানুষ ঠকাতেই এই ধরনের নাটক সাজানো হচ্ছে।” মমতা আরও অভিযোগ করেন যে, নির্বাচন এলেই প্রধানমন্ত্রীর এই ধরনের ‘রোড শো’ বা ‘খাবার খাওয়া’র আড়ালে আসলে বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে প্রচারের আলো কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলে।
বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে রান্নাবান্না বা সাধারণ মানুষের খাবার খাওয়ার সঙ্গে রাজনীতির যোগসূত্র নতুন নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও বহুবার জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকায় কখনও মোমো বানিয়েছেন, কখনও বা রাস্তার ধারের দোকানে দাঁড়িয়ে ঘুগনি বা চা তৈরি করেছেন। এমনকি চপ ভাজতেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘মাটির মানুষ’ ভাবমূর্তিকেই এবার চ্যালেঞ্জ জানাতে চেয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। আর সেই কারণেই ঝাড়গ্রামের মতো এলাকায় রাস্তার ধারের সাধারণ খাবার খেয়ে বাংলার মানুষের আবেগ ছুঁতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তাঁর নিজের কাজগুলো স্বতঃস্ফূর্ত, আর প্রধানমন্ত্রীর কাজগুলো করপোরেট কায়দায় সাজানো বিপণন মাত্র।
বীরভূমের সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দেন যে, এই ধরনের ‘ক্যামেরা মোমেন্ট’ দিয়ে বাংলার মানুষের মন জয় করা যাবে না। তিনি বলেন, “বাংলার সংস্কৃতি আর সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা মোদী বাবুর অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মানুষ জানে কারা সারাবছর তাঁদের পাশে থাকে আর কারা ভোটের সময় ঝালমুড়ি খেয়ে নাটক করে।” অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্বের পাল্টা দাবি, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা দেখে মুখ্যমন্ত্রী ভয় পেয়েছেন বলেই এই ধরনের কুরুচিকর মন্তব্য করছেন। ঝালমুড়ি খাওয়া নিয়ে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক তরজা এখন বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একে অপরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তোলা এই প্রশ্নে এখন শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কার দিকে পাল্লা ভারি করেন, সেটাই দেখার। এক ঠোঙা ঝালমুড়িকে কেন্দ্র করে এমন ‘হাই-ভোল্টেজ’ বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। সোমবারের বীরভূমের এই সভা থেকে মমতা যে ভাষায় মোদীকে আক্রমণ করেছেন, তাতে স্পষ্ট যে আগামী দিনগুলোতে আক্রমণ এবং প্রতি-আক্রমণের সুর আরও চড়বে। ঝালমুড়ি-কাণ্ড এখন নিছকই জলখাবারের গল্পে সীমাবদ্ধ নেই, তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের হাতিয়ার।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

