AB Live News
ভোটার-যুদ্ধে ‘পরিযায়ী’ অস্ত্র শমীকের
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পারদ যত চড়ছে, বাগযুদ্ধ ততটাই তপ্ত হয়ে উঠছে বাংলার রাজনৈতিক অলিন্দে। বাইরে থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোট করানোর যে অভিযোগ গত কয়েকদিন ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করে আসছিলেন, সোমবার তার এক অভূতপূর্ব ও বিস্ফোরক পাল্টা জবাব দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। মুখ্যমন্ত্রীর তোলা ‘বহিরাগত’ তত্ত্বকে কার্যত স্বীকার করে নেওয়ার ঢঙে শমীক এদিন দাবি করেন, “মুখ্যমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, আমরা বাইরে থেকে লোক ঢোকাচ্ছি।” তবে তাঁর এই মন্তব্যের নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক চাল। শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, এই ‘বাইরের লোক’ অন্য কেউ নন, তাঁরা জীবিকার তাগিদে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া খোদ বাংলারই ভূমিপুত্র পরিযায়ী শ্রমিক। নির্বাচনের আবহে কয়েক লক্ষ শ্রমিককে রাজ্যে ফিরিয়ে আনার এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এখন আবর্তিত হচ্ছে বাংলার ভোট-রাজনীতি।
এদিন এক সাংবাদিক বৈঠকে শমীক ভট্টাচার্য অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগের জবাব দেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে, গুজরাটের সুরাট, মহারাষ্ট্র, দিল্লি এবং কর্ণাটক-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে ভিটেমাটিতে ফিরে আসছেন। তাঁর দাবি, প্রায় ৭৩টি স্পেশ্যাল ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে এই শ্রমিকরা নির্বিঘ্নে রাজ্যে পৌঁছাতে পারেন। শমীকের কথায়, “মুখ্যমন্ত্রী ভয় পাচ্ছেন বলেই তাঁদের বহিরাগত বলছেন। কিন্তু এরা বাংলারই সন্তান। যাঁরা পেটের দায়ে নিজের রাজ্য ছেড়েছিলেন, তাঁরা এবার ব্যালট বক্সে নিজেদের বঞ্চনার জবাব দিতে তৈরি।” বিজেপির রাজ্য সভাপতির এই মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, ভিনরাজ্য থেকে গুন্ডা বাহিনী ঢুকিয়ে ভোট লুঠ করার ছক কষছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু শমীক সেই অভিযোগকে কৌশলে ঘুরিয়ে দিয়ে ‘পরিযায়ী শ্রমিকদের অধিকার’ রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন।
শমীক ভট্টাচার্য এদিন আরও এক ধাপ এগিয়ে আবেগতাড়িত কার্ড খেলে বলেন, “অনেকেই অভিযোগ তুলেছিলেন যে ভিনরাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য আমাদের রাজ্যের শ্রমিকদের নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে। সেই অপমানিত ও লাঞ্ছিত মানুষেরাই আজ জোটবদ্ধ হয়ে ফিরছেন। উত্তরবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা ইতিমধ্যেই নিজেদের এলাকায় পৌঁছে গিয়েছেন এবং দক্ষিণবঙ্গের শ্রমিকদের আসার প্রক্রিয়াও দ্রুত গতিতে শুরু হয়েছে।” তাঁর দাবি অনুযায়ী, বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি এবং কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টায় এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এই শ্রমিকরা রাজ্যের বর্তমান কর্মসংস্থানহীনতার প্রতীক বলে দাবি করে শমীক বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাঁদের ভোট বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে এক বড় হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬-এর নির্বাচনে পরিযায়ী শ্রমিকদের এই বিপুল সমাগম নির্বাচনী ফলাফলে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জঙ্গলমহল, উত্তরবঙ্গ এবং সুন্দরবনের মতো এলাকাগুলি থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ শ্রমিকের কাজে বাইরে থাকেন। তাঁদের এই ‘ঘর ওয়াপসি’ যদি পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুকূলে যায়, তবে অনেক আসনেই সমীকরণ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য শমীকের এই দাবিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাদের মতে, পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম করে বিজেপি আসলে ভিনরাজ্যের ক্যাডারদের রাজ্যে ঢোকানোর চেষ্টা করছে এবং ট্রেনের এই বিশেষ ব্যবস্থাও সেই পরিকল্পনারই অংশ। পাল্টাপাল্টি এই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে এখন উত্তপ্ত বাংলার রাজপথ। একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর ‘বহিরাগত’ তর্জন, আর অন্যদিকে শমীকের ‘বাংলার সন্তান’ ফেরানোর দাবি—এই দুইয়ের লড়াইয়ে সাধারণ ভোটারের মন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে ঘোরে, সেটাই এখন দেখার। নির্বাচনের নির্ঘণ্টের মাঝে শমীকের এই ‘স্বীকারোক্তি’ আসলে এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক চাপের রাজনীতি বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

