AB Live News
দিল্লিতে সোনিয়া-মমতা রুদ্ধদ্বার বৈঠক, দল বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা তৃণমূল নেত্রীর
সদ্যসমাপ্ত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় এবং দলের ভেতরে নজিরবিহীন বিদ্রোহের আবহে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিকে রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুতি এবং অন্যদিকে দলের অন্দরে সাংসদ ও বিধায়কদের গণ-দলবদল ও বিদ্রোহের জেরে দল বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছেন তৃণমূল নেত্রী। এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই গতকাল দিল্লির ১০ জনপথের বাসভবনে গিয়ে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হলেন তিনি। লোকসভা নির্বাচনের পর এবার খোদ সংসদের ভেতরে ও বাইরে তৃণমূল কংগ্রেস একপ্রকার ভাঙনের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে যে তীব্র জল্পনা ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে, তার মাঝেই সোনিয়ার সঙ্গে মমতার এই একান্ত সাক্ষাৎ জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর দিল্লির দরবারে নিজেদের অস্তিত্ব এবং রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতেই কংগ্রেসের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।
এই মেগা বৈঠকের প্রেক্ষাপটটি তৈরি হয়েছিল দিল্লিতে ইন্ডিয়া (INDIA) জোটের একটি বিশেষ সভার মাধ্যমে। সেখানে সোনিয়া গান্ধী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে এক অত্যন্ত উষ্ণ করমর্দন ও আলিঙ্গন লক্ষ্য করা যায়। তার ঠিক পরদিনই সমস্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি পাশে সরিয়ে রেখে ১০ জনপথে সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে পৌঁছে যান তৃণমূল নেত্রী। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে দুই নেত্রীর মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে তৃণমূলের অন্দরের বর্তমান সংকট নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে বলে সূত্র মারফত জানা গিয়েছে। বৈঠক শেষে তৃণমূল কংগ্রেসের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে দুই নেত্রীর হাসিমুখের ছবি পোস্ট করে লেখা হয় যে, যে কথা মুখে বলা যায় না, তা তাঁদের হাসিতেই স্পষ্ট ধরা পড়েছে। দশকের পর দশক ধরে দেশের সেবায় যুক্ত দুই নেত্রীর এই বন্ধন আগামী দিনে আরও মজবুত হবে। তবে এই বাহ্যিক সৌজন্য এবং হাসির আড়ালে যে এক গভীর রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা লুকিয়ে রয়েছে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট।
আসলে এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে বড়সড় ধাক্কা খাওয়ার পর থেকেই দলের অন্দরে তীব্র অসন্তোষের আগুন জ্বলছিল। পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, দিল্লিতে তৃণমূলের প্রায় ২০ জন লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদ ইতিমধ্যেই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেছেন এবং তাঁরা দল ছেড়ে কেন্দ্রের শাসক শিবিরের সঙ্গে বা এনডিএ জোটের সঙ্গে হাত মেলাতে চলেছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে খবর। শুধু দিল্লি নয়, খোদ বাংলার বুকেও তৃণমূলের ৮০ জনেরও বেশি বিধায়ক ইতিমধ্যেই দলত্যাগ করে আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করেছেন এবং বিধানসভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তাঁরা কাজ শুরু করেছেন। ফলে লোকসভা ও রাজ্যসভার ভেতরে কার্যত এক লপ্তে দলছুট হতে চলেছেন সিংহভাগ সাংসদ। এই গণ-বিদ্রোহের জেরে দলের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে মমতার। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এই চরম বিপর্যয়ের দিনে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং ক্ষীয়মাণ দলটিকে সম্পূর্ণ বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে সোনিয়া গান্ধীর কাছে একপ্রকার সাহায্য ও সমর্থনের আর্জি নিয়ে এসেছেন তৃণমূল নেত্রী।
আরও একটি বিষয় এই বৈঠককে অত্যন্ত নাটকীয় করে তুলেছে। ঠিক যে সময় দিল্লিতে ১০ জনপথের ভেতরে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রুদ্ধদ্বার আলোচনা চালাচ্ছিলেন, ঠিক সেই একই সময়ে কলকাতায় কালীঘাটে তৃণমূলের মূল কার্যালয় এবং মমতার বাসভবন সংলগ্ন দফতরে নজিরবিহীন অভিযান চালায় রাজ্য পুলিশের সিআইডি আধিকারিকরা। বিধানসভায় বিধায়কদের সই জালিয়াতির মামলায় রেজোলিউশন কপির খোঁজে সিআইডি যখন কালীঘাটের দফতরে তল্লাশি চালাচ্ছিল, তখন দিল্লিতে বসে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের সলতে পাকাচ্ছিলেন মমতা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের নবনিযুক্ত যুগ্ম সম্পাদক ডেরেক ও’ব্রায়েন সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, দিল্লিতে যখন বৈঠক চলছে, তখন কলকাতায় সিআরপিএফ দিয়ে ঘিরে জোরপূর্বক তৃণমূলের সদর দফতরে ফাইল লুট করার চেষ্টা করছে সিআইডি।
এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বৈঠককে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে এক নতুন গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছিলেন যে, নিজের দল বাঁচাতে হয়তো কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলকে সম্পূর্ণ মার্জ বা শামিল করে দেওয়ার মতো কোনও বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মমতা। তবে কংগ্রেস ও তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সূত্র মারফত স্পষ্ট জানা গিয়েছে যে, এই বৈঠকে কোনও দল সংযুক্তিকরণ বা মার্জারের বিষয়ে আলোচনা হয়নি। মূলত আগামী ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এখন থেকেই জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের সঙ্গে এক মজবুত কৌশলগত জোট তৈরি করা এবং সংসদের ভেতরে তৃণমূলের এই বিদ্রোহী সাংসদদের মোকাবিলা কীভাবে করা যায়, তা নিয়েই সোনিয়ার পরামর্শ নিয়েছেন মমতা। তবে ভিন রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর এবং নিজের ঘরের সাংসদ-বিধায়কদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১০ জনপথে এসে সোনিয়া গান্ধীর দ্বারস্থ হতে হল, তা প্রমাণ করে যে জাতীয় রাজনীতিতে একদা দাপুটে এই নেত্রী এখন কতটা কোণঠাসা এবং নিরুপায়। এখন দেখার, সোনিয়া গান্ধীর এই রাজনৈতিক ঢাল ব্যবহার করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ডুবতে বসা তরণীকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেন কি না।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

