AB Live News
রণক্ষেত্র টলিপাড়া
টালিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টেকনিশিয়ান্স স্টুডিও চত্বর বৃহস্পতিবার পরিণত হল এক রণক্ষেত্রে। ফেডারেশনের বৈঠককে কেন্দ্র করে দুই যুযুধান গোষ্ঠীর মধ্যে বেঁধে যাওয়া নজিরবিহীন সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে উঠল গোটা স্টুডিওপাড়া। দফায় দফায় চলল লাঠিচার্জ, ইট-পাটকেল বৃষ্টি, এমনকি একে অপরকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার মতো ঘটনাও ঘটল। পরিস্থিতি এমন চরম রূপ ধারণ করে যে শেষ পর্যন্ত রিজেন্ট পার্ক থানার বিশাল পুলিশ বাহিনীকে ঘটনাস্থলে এসে লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়। এই ঘটনার জেরে দীর্ঘক্ষণ টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো এবং সংলগ্ন এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
টলিউডের ভেতরের এই দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে এভাবে রাস্তায় নেমে আসবে, তা অনেকেই অনুমান করতে পারেননি। ঘটনার সূত্রপাত বেশ কিছুদিন ধরেই হচ্ছিল, তবে তা চরম আকার নেয় নবনির্বাচিত বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর একটি বড়সড় সিদ্ধান্তের পর। গত বুধবার তিনি আকস্মিকভাবে ফেডারেশন ভেঙে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। শুধু তাই নয়, ম্যানেজার গিল্ডের সম্পাদক মহম্মদ হাসান এবং সহসম্পাদক বাবাইকে অবিলম্বে তাদের পদ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের পরই স্টুডিওপাড়ার অন্দরে সুপ্ত থাকা ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। বৃহস্পতিবার সেই ভাঙা ফেডারেশনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা ঠিক করতেই একটি জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছিল।
প্রথমেই বৈঠকটি টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওর ভেতরে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল থেকেই দুই পক্ষের হাজার হাজার সমর্থক ও সাধারণ টেকনিশিয়ানরা স্টুডিওর সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন। তিল ধারণের জায়গা ছিল না স্টুডিওর ভেতরে। উপচে পড়া ভিড়ের কারণে শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি স্থানান্তরিত করতে হয় স্থানীয় ভরাট মাঠে। কিন্তু মাঠের উন্মুক্ত পরিবেশেই দুই পক্ষ একে অপরের মুখোমুখি হয়ে যায়। এক পক্ষ দাবি করতে থাকে, হাসান ও বাবাই পনেরো বছর ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে টলিপাড়াকে কুক্ষিগত করে রেখেছেন এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয়ে এখন বহিরাগতদের এনে জোর করে ঝামেলা পাকাচ্ছেন। অন্যদিকে হাসান অনুগামীরা পালটা দাবি করেন, যারা মাঠে এসে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন তারা আদতে এই গিল্ডেরই সদস্য নন, বরং টলিপাড়ার পরিবেশ নষ্ট করতে বাইরে থেকে লোক ভাড়া করে আনা হয়েছে।
এই বাদানুবাদ চলাকালীনই হঠাৎ পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। হাসান ও বাবাইয়ের নাম ধরে ‘চোর চোর’ স্লোগান উঠতে শুরু করলে মাঠের পরিবেশ অগ্নিগর্ভ ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে তর্কাতর্কি হাতাহাতিতে রূপ নেয়। দুই পক্ষের সমর্থকরা একে অপরের ওপর চড়াও হয়। শুরু হয় দেদার মারপিট। মাঠের চারপাশ থেকে ইট, পাথর এবং পাটকেল বৃষ্টির মতো পড়তে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কোত্থেকে যেন বস্তা বস্তা ডিম চলে আসে এবং একে অপরকে লক্ষ্য করে অনবরত ডিম ছোড়া হতে থাকে। সাধারণ টেকনিশিয়ান এবং পথচারীরা যে যেদিকে পারেন প্রাণভয়ে ছুটতে শুরু করেন। গোটা এলাকা মুহূর্তের মধ্যে এক যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা নেয়। বন্ধ হয়ে যায় স্থানীয় দোকানপাট।
এই নজিরবিহীন হিংসা ও অরাজকতা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিজেপি নেতা তথা বিশিষ্ট অভিনেতা রুদ্রনীল চক্রবর্তী। টলিপাড়ার এই ঘটনাকে অত্যন্ত লজ্জাজনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আজ টালিগঞ্জের টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওর সামনে যা ঘটল, তা আসলে গত পনেরো বছর ধরে চলা একদল নেতার সীমাহীন দুর্নীতি, তোলাবাজি এবং একনায়কতন্ত্রের অবশম্ভাবী পরিণতি। সাধারণ গরিব টেকনিশিয়ানদের রক্ত জল করা পয়সা লুঠ করে যারা নিজেদের আখের গুছিয়েছে, আজ ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয়ে তারাই গুন্ডামি করছে। থ্রেট কালচার আর ব্যান কালচারের মাধ্যমে এরা এতদিন টলিউডের সুস্থ পরিবেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। পাপিয়া অধিকারী যে কড়া পদক্ষেপের বার্তা দিয়েছেন, তাকে আমি পূর্ণ সমর্থন করি। টলিপাড়াকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে এবং সাধারণ কর্মীরা যাতে শান্তিতে কাজ করতে পারেন, তার ব্যবস্থা প্রশাসনকে করতে হবে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক প্রবীণ টেকনিশিয়ানও ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, গত পনেরো বছর ধরে ক্ষমতার জোরে এরা টলিপাড়ায় একের পর এক অনিয়ম করে গিয়েছেন। সাধারণ কর্মীদের খাটিয়ে টাকা দেওয়া হয়নি। এখন ভোটে হেরে গিয়েও এরা নোংরামি করে গদি আঁকড়ে বসে থাকতে চাইছেন। বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, হাসানের নামে শহরের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং গ্যারেজ রয়েছে। একজন সাধারণ ফেডারেশন কর্তার কোথা থেকে এত সম্পত্তি এল, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে এবং এই বিপুল সম্পত্তির উৎস তদন্ত করে দেখার দাবিও উঠেছে।
এদিকে টলিপাড়ায় দুর্নীতি দমনে কোমর বেঁধে নেমেছেন পাপিয়া অধিকারী। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, টলিউডে বহু বছর ধরে চলা এই নোংরা সংস্কৃতির অবসান ঘটানোই তাঁর মূল লক্ষ্য। টলিপাড়ার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বহিরাগত ও দুর্নীতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করতে খুব শীঘ্রই বিশেষ এসআইআর প্রক্রিয়া চালু করা হবে। টলিউডের কুখ্যাত ‘ব্যান’ ও ‘সাসপেনশন’ কালচারের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করে তিনি ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’ মডেল অনুসরণ করার কথা ঘোষণা করেছেন। পুরনো ২৬টি গিল্ডের একাধিপত্য ভেঙে দিয়ে সিনেমার কাজের সুবিধার্থে এবার পুরো কাঠামোকে মাত্র চারটি মূল বিভাগে ভাগ করা হয়েছে, সেগুলি হল সিনেম্যাটোগ্রাফি, পরিচালক, প্রোডাকশন কন্ট্রোল এবং আর্ট অ্যান্ড কস্টিউম।
টালিগঞ্জের এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা অবশ্য নতুন কিছু নয়। গত কয়েক বছর ধরেই ফেডারেশন বনাম ছোট পর্দার প্রযোজকদের দ্বন্দ্ব, টেকনিশিয়ানদের অসহযোগিতা, মাসের পর মাস বকেয়া পারিশ্রমিক আটকে থাকা, অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়েও টাকা না দেওয়া এবং সামান্য কারণে শিল্পী বা কলাকুশলীদের ‘থ্রেট’ ও ‘ব্যান’ করার সংস্কৃতি নিয়ে বারবার ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল হলেও এই জটিল জট কিছুতেই কাটছিল না, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটল রবিবারের এই নজিরবিহীন হিংসাত্মক ঘটনার মাধ্যমে।
এই ঘটনায় সাধারণ শিল্পীদের একাংশ চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ। তাঁদের মতে, পুরনো নেতৃত্ব এখনও ক্ষমতা ছাড়তে চাইছে না বলেই এই ধরনের গুন্ডামি করা হচ্ছে। police এসে লাঠি উঁচিয়ে আপাতত পরিস্থিতি শান্ত করলেও টলিপাড়ার অন্দরে চাপা উত্তেজনা এখনও বজায় রয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। এই ধরনের ঘটনার ফলে গোটা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের কাছে কালিমালিপ্ত হচ্ছে। দর্শকরাও চান যে স্টুডিওপাড়ার অন্দরে সুস্থ ও স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ ফিরে আসুক।
রিজেন্ট পার্ক থানার পুলিশ পুরো ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এবং মোবাইল ভিডিওর সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তবে কোনও পক্ষের তরফেই এখনও পর্যন্ত থানায় নির্দিষ্ট করে কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। আপাতত টেকনিশিয়ান স্টুডিও চত্বরে পুলিশ পিকেট বসানো হয়েছে। টলিপাড়ার এই উত্তেজনা সাময়িকভাবে স্তিমিত হলেও এর রেশ যে বহু দূর গড়াবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই সিনেমা মহলের। নতুন নেতৃত্ব কীভাবে এই বিপুল অচলাবস্থা কাটিয়ে টলিউডকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনে, এখন সেটাই দেখার।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

