AB Live News
তোলাবাজির ‘গ্যালাক্সি’ চূর্ণ, ধৃত তৃণমূলের উপপ্রধান
কোটি কোটি টাকার তোলাবাজি ও ক্ষমতার দম্ভের এক চরম নিদর্শন খড়দহের বন্দিপুর এলাকা। এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী মহলে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সলমন খানের কায়দায় হাবেভাবে সুপারস্টার ও কাজে মস্তানি চালিয়ে আসছিলেন বন্দিপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান প্রসেনজিৎ সাহা। ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে এবং সাধারণ মানুষের পকেট কেটে তোলাবাজির টাকায় গড়ে তুলেছিলেন এক প্রাসাদোপম অট্টালিকা, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘পি গ্যালাক্সি হাউস’। সেই বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদের মালিক, খড়দহের দাপুটে তৃণমূল নেতা তথা বন্দিপুরের পঞ্চায়েত উপপ্রধান প্রসেনজিৎ সাহাকে অবশেষে গ্রেপ্তার করল রহড়া থানার পুলিশ। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তৃণমূল সরকার ভূপতিত হতেই এই প্রভাবশালী নেতার সাম্রাজ্যে ভাঙন ধরল। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত নেতাকে রহড়া থানার পক্ষ থেকে বারাকপুর আদালতে পেশ করা হবে এবং নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হবে।
এলাকার রাজনৈতিক মহল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, পঞ্চায়েতের উপপ্রধান পদের অপব্যবহার করে এলাকায় এক প্রকার সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা চালাতেন প্রসেনজিৎ। কোনও ব্যবসায়ী নতুন কাজ শুরু করতে গেলে বা কোনও সাধারণ মানুষ নিজের জমিতে বাড়ি তৈরি করতে গেলেই মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হত। টাকা দিতে অস্বীকার করলেই জুটত অকথ্য গালিগালাজ ও প্রাণে মারার হুমকি। শুধু তোলাবাজি বা হুমকিই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের দু’ধারে থাকা বিঘার পর বিঘা বিস্তৃত প্রাকৃতিক জলাজমি বেআইনিভাবে ভরাট করার মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। সেইসব জলাজমি রাতের অন্ধকারে মাটি ও আবর্জনা দিয়ে ভরাট করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চড়া দামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এলাকায় প্রসেনজিতের দাপট দিনদিন এতটাই বাড়তে থাকে যে তাঁর ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পেতেন না। বিধানসভা ভোটের আগে দলের অন্দরে ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার মদমত্ততায় তিনি সেইসব সতর্কবার্তাকে বিন্দুমাত্র কান দেননি। নিজের পদাধিকার এবং দলীয় ছত্রছায়াকে ঢাল করে এলাকায় দুষ্কৃতী দৌরাত্ম্য অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।
গত ২৯ এপ্রিল খড়দহ বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনের দিন প্রসেনজিতের এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রথম বড়সড় পদক্ষেপ করে কেন্দ্রীয় বাহিনী। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা তাঁর সেই বিলাসবহুল ‘গ্যালাক্সি’ আবাসে তল্লাশি চালিয়েছিল। কিন্তু সেই সময় চতুর এই নেতা পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এলাকা থেকে চম্পট দেন। দীর্ঘদিন ফেরার থাকার পর অবশেষে পুলিশের পাতা জালে ধরা পড়েন তিনি। বন্দিপুরের এই তৃণমূল উপপ্রধান গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই পুরো জেলা জুড়ে এখন প্রধান চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁর সাধের ‘পি গ্যালাক্সি হাউস’। বাড়িটির জাঁকজমক ও বহর দেখলে যে কেউ চোখ কপালে তুলবেন। সাধারণ কোনও প্রাসাদ বা বিলাসবহুল হোটেলের সঙ্গে তুলনা করলেও এই বাড়িকে কম বলা হয়। বিশালাকার প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে অন্দরমহলের কারুকার্য যে কোনও সাত তারা হোটেলকেও অনায়াসে হার মানিয়ে দেয়। বাড়ির ভেতরে রয়েছে দেশ-বিদেশ থেকে আনা দামি দামি কাঠের আসবাবপত্র, তুলতুলে গদির বিছানা এবং জানলা-দরজার চোখধাঁধানো শৌখিন পর্দা। দীর্ঘ সুসজ্জিত প্রবেশপথ পেরিয়ে মূল ঘরে ঢুকলে সাধারণ মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বিশাল প্রাসাদের ইঁটে ইঁটে জড়িয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের রক্ত জল করা টাকা। তোলাবাজি ও সিন্ডিকেটের কালো টাকা ধীরে ধীরে জমিয়ে এই কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য খাড়া করেছিলেন প্রসেনজিৎ। এই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির কোনও বৈধ উৎস বা হিসাব তাঁর কাছে নেই বলেই প্রাথমিক তদন্তে অনুমান পুলিশের। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে ভুরি ভুরি লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ জমা পড়লেও পূর্বতন সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশ এতদিন তাঁর গায়ে হাত দেওয়ার সাহস পায়নি। ফলে খড়দহ ও সংলগ্ন এলাকায় খুল্লামখুল্লা নিজের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিলেন এই নেতা। তবে রাজ্যে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে গিয়েছে। নতুন সরকারের আমলে যে এই ধরনের তোলাবাজি ও তৃণমূলের দুষ্কৃতীরাজের অবসান ঘটবে, তা আগেই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এবার সেই প্রতিশ্রুতিরই বাস্তবায়ন হাতেনাতে দেখা গেল খড়দহের এই হেভিওয়েট নেতার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। এই ঘটনার পর বন্দিপুর এলাকায় মিষ্টি বিলি করেন সাধারণ মানুষের একাংশ। রহড়া থানার পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে আর কারা কারা জড়িত এবং এই বিপুল সম্পত্তির নেপথ্যে আর কার কার হাত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে প্রসেনজিৎ সাহাকে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

