AB Live News
চিকিৎসা পরিষেবার বেহাল কাঠামো ফেরাতে এবার কড়া দাওয়াই নবান্নের
রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলতে এক নজিরবিহীন ও বড়সড় পদক্ষেপ করল নবান্ন। মুখ্যমন্ত্রী পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকেই রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবার বেহাল পরিকাঠামো ফেরাতে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারি হাসপাতালে এসে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে কিংবা বেড না পেয়ে কোনও রোগীকে যাতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়ে ফিরে যেতে না হয়, সেই বিষয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরকে আগেই কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্পষ্ট ও কঠোর প্রশাসনিক নির্দেশের পরেও খাস কলকাতার বুকে নামী সরকারি হাসপাতালে রোগীরা বেড পাচ্ছেন না বলে ভুরি ভুরি অভিযোগ জমা পড়ছিল নবান্নে। এই চরম গাফিলতি ও উদাসীনতার বিরুদ্ধে এবার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করল রাজ্য প্রশাসন। সরাসরি রোগী প্রত্যাখানের অভিযোগে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার তথা এমএসভিপি চিকিৎসক অঞ্জন অধিকারীকে অত্যন্ত আকস্মিকভাবে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। নবান্ন সূত্রের খবর, কর্তব্য গাফিলতির শাস্তিস্বরূপ তাঁকে একলপ্তে সুদূর উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে।
সোমবার রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা ও সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এমএসভিপি চিকিৎসক অঞ্জন অধিকারীকে রায়গঞ্জ সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে বদলি করা হল। তাঁর এই আকস্মিক অপসারণে তৈরি হওয়া শূন্য পদে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব সামলানোর জন্য অবিলম্বে বেছে নেওয়া হয়েছে অধ্যাপক চিকিৎসক শান্তনু সেনকে। তিনি বর্তমানে ওই হাসপাতালেরই জেনারেল সার্জারি বিভাগে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কর্মরত রয়েছেন। গত ২৫ মে সোমবার থেকেই এই নয়া নির্দেশিকা অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে। এই নজিরবিহীন ও কঠোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের সমগ্র চিকিৎসা মহলকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইলেন যে, আমজনতার স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র খামতি বা কর্তব্যে সামান্যতম গাফিলতিও কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও নিয়মানুবর্তিতা ফিরিয়ে আনতে নতুন সরকার যে কতটা বদ্ধপরিকর, এই বদলি তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ। বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে রাজ্যের প্রায় প্রতিটি সরকারি হাসপাতালেই এক শ্রেণির অসাধু চক্র তথা দালালরাজের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের শেষ ছিল না। হাসপাতালে বেড খালি থাকা সত্ত্বেও সাধারণ অসহায় ও গরিব মানুষদের ফিরিয়ে দেওয়া হত এবং পর্দার আড়ালে মোটা টাকার বিনিময়ে দালালদের মাধ্যমে রোগীদের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হত বলে ভুরি ভুরি অভিযোগ উঠত। পূর্বতন আমলের সেই শিকড় গেড়ে বসা দালালরাজ এবার পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে রাজ্যের নতুন স্বাস্থ্য দপ্তর। এই চক্রের সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে বা বাইরে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে কড়া শাস্তির মুখে দাঁড় করানো হবে।
নবান্ন সূত্রের খবর, প্রথম দফায় কলকাতার প্রধান পাঁচটি বড় সরকারি হাসপাতালকে সম্পূর্ণ আধুনিক রূপে ঢেলে সাজাতে বিশেষ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে রাজ্য সরকার। চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়নের পাশাপাশি হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও আমূল বদলে ফেলা হচ্ছে এবং অত্যন্ত আঁটসাঁট করা হচ্ছে। বিগত দিনে বারবার দেখা গিয়েছে, হাসপাতালে চিকিৎসায় সামান্য গাফিলতির অজুহাত তুলে বা কোনও আকস্মিক অশান্তিকে কেন্দ্র করে বহিরাগত দুষ্কৃতীরা চড়াও হয়ে হাসপাতালের বহুমূল্য সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করত। এই ধরনের অরাজকতা ও সরকারি সম্পত্তি নষ্টের ঘটনা কঠোর হাতে রুখতে এবার থেকে প্রতিটি বড় হাসপাতালে চব্বিশ ঘণ্টা কড়া পুলিশি নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নতুন আইনি নিয়মে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করলে দোষীদের বিরুদ্ধে মোটা টাকা জরিমানা এবং দীর্ঘমেয়াদি জেল হেফাজতের মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা হবে। হাসপাতালের সামগ্রিক নিরাপত্তা রক্ষা এবং বহিরাগত অনাকাঙ্ক্ষিত লোকেদের গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য একটি বিশেষ আধুনিক সিসিটিভি কন্ট্রোল রুম ও মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি হাসপাতালেই নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা একধাক্কায় বেশ কিছুটা বাড়ানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের মূল গেট বা প্রবেশদ্বারগুলিতেও এবার থেকে থাকবে কড়া সশস্ত্র পুলিশি পাহারা। হাসপাতালে সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশ এবার থেকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ইচ্ছে করলেই আর কোনও দর্শনার্থী কিংবা রোগীর আত্মীয়রা যখন-তখন সরকারি হাসপাতালের ভেতরে বিনা কারণে ঘুরে বেড়াতে পারবেন না। হাসপাতালের প্রধান প্রবেশ পথেই প্রত্যেকের পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কড়া তল্লাশি করে তবেই ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট পরিদর্শনের সময় ছাড়া রোগীর পরিবারের কোনও সদস্যকে হাসপাতালের ওয়ার্ড বা চত্বরে অহেতুক ঘুরে বেড়াতে দেখা গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে জরুরি পরিষেবা ছাড়া বহিরাগত কোনও ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক যানবাহন আর প্রবেশ করতে পারবে না বলেও কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল চত্বরকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত ও নিরাপদ করতে আরও একধাপ এগিয়ে সমস্ত বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী, অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা প্রদানকারী চালক এবং অন্যান্য অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের একটি বিস্তারিত তথ্যভাণ্ডার বা ডিজিটাল ডেটাবেস আগামী একমাসের মধ্যে তৈরি করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সংস্কারমূলক ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে আগামী দিনে সরকারি হাসপাতালের অন্দরে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও হেনস্থা অনেকটাই কমবে বলে আশা করছে ওয়াকিবহাল মহল।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

