Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

রূপশ্রীর ফাঁদ ও কোটিপতি গরিব

0 19,076,389

 ‘বাবা স্রেফ অন্যের গাড়ি চালান বাবু। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় আমাদের। সামান্য রোজগার। দয়া করে একটু দেখবেন স্যার, আমরা খুবই গরিব পরিবার। বিয়ের খরচের ভার বইতে পারছি না। অনুদানটা যেন কোনওভাবে আটকে না যায়।’ বিধাননগর পুরসভার রূপশ্রী প্রকল্পের বিভাগে আবেদন জমা দেওয়ার সময় কাউন্টারের ওপারে থাকা কর্মীদের হাতজোড় করে ঠিক এইভাবেই কাতর অনুরোধ জানিয়েছিলেন এক তরুণী। চোখেমুখে ছিল চরম অসহায়তার ছাপ, আর গলায় ছিল আকুল আর্তি। সরকারি নিয়ম মেনে পুরসভার কর্মীরা সেই আবেদন গ্রহণ করেন এবং যথারীতি সরকারি নিয়মমাফিক স্ক্রুটিনি ও নথিপত্র খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়। কিন্তু সরকারি প্রকল্পের ২৫ হাজার টাকা অনুদান পাওয়ার জন্য তৈরি করা সেই ‘গরিবিয়ানার’ সাজানো চিত্রনাট্যের অন্দরে যে এত বড় এক জালিয়াতি লুকিয়ে রয়েছে, তা তখনও ঘুণাক্ষরেও টের পাননি পুরকর্মীরা।

নিয়ম অনুযায়ী, রূপশ্রী প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় এবং প্রধান শর্ত হল আবেদনকারীর পারিবারিক বার্ষিক আয় দেড় লক্ষ টাকার কম হতে হবে। অর্থাৎ, অত্যন্ত দুঃস্থ এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের কন্যাসন্তানদের বিয়ের জন্যই এই এককালীন ২৫ হাজার টাকার সরকারি অনুদান বরাদ্দ থাকে। বিধাননগর পুরসভার রূপশ্রী বিভাগের আধিকারিকরা সল্টলেকের দপ্তরে ওই তরুণীর আবেদনপত্রটি পাওয়ার পর প্রাথমিক নথিপত্র খতিয়ে দেখেন। সমস্ত কিছু প্রথম নজরে ঠিকঠাক মনে হলেও, সরকারি নিয়ম মেনে মাঠপর্যায়ে বা সরেজমিনে তদন্ত করা বাধ্যতামূলক। সেই নির্দেশিকা মেনেই বিধাননগর পুরসভার তরফে রূপশ্রী প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা আধিকারিক অংশুমান ধর সহ দু’জন কর্মীর একটি বিশেষ তদন্তকারী দল ওই তরুণীর দেওয়া কৈখালির ঠিকানায় সশরীরে পৌঁছন। আর সেখানে গিয়ে যা দেখলেন, তাতে পুরসভার পোড়খাওয়া কর্মীদেরও চোখ এক্কেবারে কপালে ওঠার জোগাড় হল।

তদন্তকারী দল ওই তরুণীর বাড়ির সামনে পৌঁছতেই প্রথমে থমকে যান। যে বাবা সামান্য দিনমজুর বা অন্যের গাড়ির চালক বলে দাবি করা হয়েছিল, তাঁদের বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝকঝকে দু-দুটি চারচাকা গাড়ি। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে গোপনে খোঁজ নিয়ে আধিকারিকরা জানতে পারেন, ওই তরুণীর বাবা আদতে কোনও সাধারণ চালক নন, তিনি নিজেই ওই দুটি বিলাসবহুল গাড়ির মালিক এবং সেগুলি ভাড়ায় খাটিয়ে প্রতি মাসে মোটা টাকা উপার্জন করেন। এরপর কর্মীরা যখন ওই তরুণীর অন্দরমহলে প্রবেশ করেন, তখন তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার চূড়ান্ত পর্বটি বাকি ছিল।

কোথায় অভাব আর কোথায় দারিদ্র্যের ছাপ! বসার ঘরে পা রাখতেই কর্মীদের নজর কাড়ে দেওয়ালে টাঙানো বিশাল আকারের এক আধুনিক স্মার্ট টিভি, যার বাজারমূল্য অন্তত লক্ষাধিক টাকা। ঘরের কোণে সগর্বে চলছে ব্র্যান্ডেড এয়ার কন্ডিশনার বা এসি। শুধু তাই নয়, একটু এগিয়ে রান্নাঘরের দিকে তাকাতেই দেখা গেল আধুনিক মডিউলার কিচেনের সেটআপ, যা অত্যন্ত উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার ছাড়া দেখা মেলা ভার। ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন থেকে শুরু করে আধুনিক জীবনযাপনের সমস্ত বিলাসবহুল উপাদানে ঠাসা সেই বাড়ি। যে পরিবারের বার্ষিক আয় দেড় লক্ষ টাকার কম হওয়ার শংসাপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের অন্দরের জাঁকজমক ও বৈভব দেখে পুরকর্মীদের বুঝতে আর এক মুহূর্তও সময় লাগেনি যে, সরকারি কোষাগারের টাকা হাতানোর জন্য এটি একটি পরিকল্পিত এবং চরম অসৎ প্রচেষ্টা ছিল।

তদন্তকারী দলের সদস্যরা যখন সমস্ত প্রমাণ হাতে নাতে পেয়ে যান এবং তরুণী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নথির সঙ্গে বাস্তবের অমিলের কথা জানান, তখন পরিবারের সদস্যদের সেই ‘গরিব’ সাজার অভিনয় কর্পূরের মতো উবে যায়। মুহূর্তের মধ্যে তাঁদের মুখের চাটুকারিতা ও কাতরতার জায়গা নেয় চরম অপ্রস্তুত ও কাঁচুমাচু ভাব। পুরকর্মীদের সামনে কোনও অজুহাত খাড়া করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত অপরাধী সুলভ ভঙ্গিতে তরুণী ও তাঁর অভিভাবকরা বলে ওঠেন, ‘ভুল হয়ে গিয়েছে স্যার। আমাদের ক্ষমা করে দিন।’ তবে বিধাননগর পুরসভার আধিকারিকরা এই চরম প্রতারণার মুখে কোনও নরম মনোভাব দেখাননি। সরকারি টাকা যাতে কোনওভাবেই অপচয় না হয় এবং প্রকৃত দুঃস্থরা যাতে বঞ্চিত না হন, তার জন্য তৎক্ষণাৎ ওই তরুণীর রূপশ্রী প্রকল্পের আবেদনটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে দপ্তরের পক্ষ থেকে। সেই সঙ্গে ওই পরিবারের সদস্যদের তীব্র ভর্ৎসনা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যাতে রূপশ্রী বা অন্য কোনও সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই ধরনের জালিয়াতি বা অসত্য তথ্য পেশ করার ধৃষ্টতা তাঁরা না দেখান, সে ব্যাপারে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ধরনের ঘটনা কেবল একক কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, ভুয়ো আয়ের শংসাপত্র বা ইনকাম সার্টিফিকেট তৈরি করে অনেক সচ্ছল পরিবারের মানুষও এই ধরনের জনকল্যাণমূলক সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করার চেষ্টা চালান। যার ফলে প্রকৃত গরিব ও প্রান্তিক মানুষ, যাঁদের এই ২৫ হাজার টাকার অনুদান অত্যন্ত প্রয়োজন, তাঁরা অনেক সময়ই লাইনে পিছিয়ে পড়েন। বিধাননগর পুরসভার রূপশ্রী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক অংশুমান ধর এই বিষয়ে বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রতিটি আবেদনপত্র খতিয়ে দেখি। গরিব সেজে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে আবেদন করেছিলেন ওই তরুণী। সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে দেখলাম, দুটি গাড়ির মালিক ওঁরা, বাড়িতে এসি এবং লক্ষ টাকার টিভি চলছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে ওই আবেদন বাতিল করে দিয়েছি। সরকারি রাজকোষের টাকা এবং সাধারণ মানুষের করের অর্থ যাতে কোনওভাবেই অপাত্রে অপচয় না হয়, তার জন্য আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই এভাবে কড়া এবং নিখুঁত তদন্ত জারি রাখব।’ এই ঘটনার পর বিধাননগর পুরসভা এলাকায় রূপশ্রী সহ অন্যান্য সমস্ত সামাজিক প্রকল্পের আবেদনপত্র স্ক্রুটিনি করার প্রক্রিয়া আরও কয়েক গুণ জোরদার করা হয়েছে বলে নবান্ন ও পুর প্রশাসন সূত্রে খবর।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper