AB Live News
সীমান্তে ঘাসফুলের ‘উন্নয়ন’, ধৃত নারী পাচারকারী নেতা
রাজ্যে ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর সরকার নারীদের সুরক্ষায় কত শত প্রকল্প এনেছে, তার খতিয়ান দিতে শাসকদলের নেতাদের গলা শুকিয়ে যায়। কিন্তু সেই সুরক্ষার চাদর যে আসলে কতটা ফুটো আর তার আড়ালে থাকা জনপ্রতিনিধিরা যে কোন কোন ‘আন্তর্জাতিক সমাজসেবামূলক’ কাজে যুক্ত, তা আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল। দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে নারী পাচারের আন্তর্জাতিক চক্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলেন গঙ্গারামপুর পঞ্চায়েত সমিতির দাপুটে তৃণমূল সদস্য আনারুল মিয়া। ঘাসফুল শিবিরের এই নেতার মহিমায় এবার খাঁচাবন্দি হতে হল শাসকদলকে। কোচবিহারের এক অসহায় গৃহবধূ ও তাঁর নাবালিকা কন্যাকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে পাচার করে দেওয়ার মতো ‘মহৎ’ এবং লাভজনক ব্যবসায়ের সঙ্গে এই নেতার নাম জড়ানোয় স্বভাবতই আলোড়ন পড়ে গিয়েছে রাজ্যে। তবে ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ বালি, কয়লা, গরু আর চাকরি বিক্রির পর মানুষ পাচারই তো এখন স্থানীয় স্তরের নেতাদের প্রধান কুটির শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। পঞ্চায়েত স্তরের একজন নেতা যে কেবল নিজের এলাকার নর্দমা আর রাস্তা সংস্কারেই আটকে নেই, বরং আন্তর্জাতিক স্তরে মানবসম্পদ রপ্তানির মতো জটিল বাণিজ্য সামলাচ্ছেন, এটা তো এক প্রকার ‘উন্নয়ন’-এরই নতুন দিগন্ত।
এই আন্তর্জাতিক নাটকের পটভূমি তৈরি হয়েছিল ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে। কোচবিহারের এক সরল মনা গৃহবধূ ও তাঁর নাবালিকা কন্যা হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান। তদন্তের গভীরে ঢুকে পুলিশ জানতে পারে, এটি কোনও সাধারণ নিখোঁজের ঘটনা ছিল না, বরং এর পেছনে কাজ করছিল এক সুপরিকল্পিত প্রেমের ফাঁদ। তৃণমূলের ছায়ায় বড় হওয়া দুলাল মিয়া নামক এক ‘রোমিও’ ওই গৃহবধূর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। প্রেমের জোয়ারে ভেসে নিজের নাবালিকা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঘর ছাড়েন ওই মহিলা। গঙ্গারামপুরে আসার পর শুরু হয় আসল খেলা, যা বর্তমান রাজনীতির রীতির সঙ্গে বেশ খাপ খেয়ে যায়। সেখানে ওই মহিলার কিছু আপত্তিকর ছবি তোলা হয় বলে অভিযোগ। শাসকদলের ছত্রছায়ায় থাকা দুষ্কৃতীদের কাছে ব্ল্যাকমেইলিং যে কত বড় অস্ত্র, তা তো রাজ্যবাসী রোজই দেখছেন। এর পরই আসরে নামেন গঙ্গারামপুর পঞ্চায়েত সমিতির প্রভাবশালী তৃণমূল সদস্য আনারুল মিয়া। প্রেমের নাটক নিমেষের মধ্যে রূপান্তরিত হয় আন্তর্জাতিক মানব পাচার বাণিজ্যে। আনারুলের সক্রিয় সহযোগিতা ও দালালি বুদ্ধিতে ভর করে দুলাল মিয়া এবং তার সহযোগী দালাল শাহাজাত হোসেন মণ্ডল হিলি সীমান্ত দিয়ে ওই মা ও মেয়েকে বাংলাদেশে পাচার করে দেয়। যে সীমান্ত দিয়ে কাঁটাতারের পাহারা গলে মানুষ পাচার হয়ে গেল, সেখানে শাসকদলের নেতাদের যে অবাধ যাতায়াত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে কেবল পাচার করেই ক্ষান্ত হয়নি এই চক্র। অসহায় মহিলার পরিবারের কাছে ফোন করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ভাবখানা এমন, যেন মানুষের জীবনও এখন তোলাবাজির নতুন উৎস। নিরুপায় পরিবার টাকা দেওয়ার পাশাপাশি হিলি থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি দায়ের করে। পুলিশ যখন তদন্তে নামে, তখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সূত্র ধরে একে একে দুলাল মিয়া ও শাহাজাত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের সহযোগিতায় হিলির শূন্য রেখা থেকে অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পাচার হওয়া সেই মহিলা ও তাঁর নাবালিকা কন্যাকে উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া মা-মেয়ের মুখ থেকে যখন এই রোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ সামনে আসে, তখন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে আস্ত কেউটে সাপটি বেরিয়ে পড়ে। জানা যায়, এই গোটা পাচার পর্বের মূল পান্ডা বা সহায়তাকারী ছিলেন স্বয়ং তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য আনারুল মিয়া।
মজার বিষয় হল, মূল দুই অভিযুক্ত দুলাল ও শাহাজাত গ্রেপ্তার হলেও বর্তমান বিচার ব্যবস্থার ফাঁক গলে বা অদৃশ্য কোনও হাত মাথার ওপর থাকায় তারা বর্তমানে দিব্যি জামিনে মুক্ত হয়ে হাওয়া খাচ্ছিল। অন্য দিকে, দলের নাম ভাঙিয়ে এবং পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এতদিন বহাল তবিয়তে বাইরেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তৃণমূল নেতা আনারুল মিয়া। অবশেষে পাপের ঘড়া পূর্ণ হওয়ায় গত শুক্রবার রাতে হিলির বৈকুন্ঠপুর এলাকা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। শনিবার তাঁকে বালুরঘাট জেলা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁর চার দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। বালুরঘাট জেলা আদালতের আইনজীবী সঞ্জয় সরকার এই বিষয়ে জানিয়েছেন যে, এই নির্মম অপহরণ ও পাচারের ঘটনায় দফায় দফায় তিনবারে মোট ৩০ হাজার টাকা নিয়েছিল অভিযুক্তরা। টাকার অঙ্ক দেখে অনেকেই হাসছেন, কারণ একজন গৃহবধূ আর তাঁর নাবালিকা কন্যার জীবনের দাম এই তৃণমূল নেতার কাছে মাত্র ৩০ হাজার টাকা! মাত্র কয়েক হাজার টাকার জন্য দেশের সুরক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভিনদেশে মানুষ পাচার করে দেওয়া নেতারাই এখন নাকি এলাকার মানুষের ভাগ্যবিধাতা। এই ঘটনার পর তৃণমূল নেতৃত্ব যথারীতি ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে পড়েছে। তাদের দাবি, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় এবং এর সঙ্গে দলের কোনও যোগ নেই। তবে আমজনতা ভালোই বোঝেন, দলের টিকিট না থাকলে সীমান্তে এমন পাচারের কারবার চালানো সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এখন দেখার, পুলিশি হেফাজতে গিয়ে এই ঘাসফুল নেতা আর কোন কোন রাঘববোয়ালের নাম উগরে দেন, নাকি চার দিন পর তিনিও জামিন পেয়ে আবার ‘জনসেবায়’ মগ্ন হন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

