Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

বাগডুবির জঙ্গল থেকে রাজভবন: মন্ত্রী ক্ষুদিরাম

0 498,216,796

 শীতের সেই হাড়কাঁপানো রাতের কথা আজও ভুলতে পারেনি বাঁকুড়ার রানিবাঁধ ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম বাগডুবি। সালটা ছিল ২০০৬, ১৬ ডিসেম্বর। গভীর রাতে পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে নেমে আসা মাওবাদীদের সঙ্গে সিআরপিএফের সেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কেঁপে উঠেছিল জঙ্গলমহল। বুলেটের শব্দ আর বারুদের গন্ধে সেদিন যে বিভীষিকা তৈরি হয়েছিল, তার সাক্ষী ছিল বাগডুবি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ। দুই মাওবাদী এবং সিআরপিএফ জওয়ান বিনোদ রাইয়ের রক্তে ভিজেছিল গ্রামের মাটি। ২০ বছর পর সেই অভিশপ্ত ইতিহাসের বুক চিরে আজ এক নতুন ভোরের সূর্যোদয় দেখল বাগডুবি। সেই গ্রামেরই ভূমিপুত্র, একসময়ের সাধারণ স্কুল শিক্ষক ক্ষুদিরাম টুডু শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। মাওবাদী সংঘর্ষের ক্ষত বয়ে বেড়ানো এক জনপদ থেকে সোজা রাজ্যের নীতিনির্ধারণী অলিন্দে ক্ষুদিরামের এই উত্তরণকে আধুনিক বাংলার ইতিহাসের এক অন্যতম বড় রূপকথা হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল।

বাঁকুড়ার জঙ্গলঘেরা এই গ্রামটিতে জন্ম এবং বড় হয়ে ওঠা ক্ষুদিরামের পথচলাটা সহজ ছিল না। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে তাঁকে প্রতিদিন ১০ কিলোমিটার দূরে বারিকুল হাই স্কুলে যেতে হতো। উচ্চমাধ্যমিকের পর শালডিহা কলেজ থেকে স্নাতক হন তিনি। কঠোর পরিশ্রমের পর শিক্ষকতার চাকরি পান বর্ধমান বাণীপীঠ হাই স্কুলে। কিন্তু মাটির টান আর জঙ্গলমহলের মানুষের বঞ্চনার যন্ত্রণা তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি। শিক্ষকতার পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালের নির্বাচনে রানিবাঁধ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে লড়েও জয়ের স্বাদ পাননি তিনি। কিন্তু জেদ ছাড়েননি এই লড়াকু শিক্ষক। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃতীয়বারের প্রচেষ্টায় তৃণমূলের তনুশ্রী হাঁসদাকে ৫২ হাজার ২৫৯ ভোটের বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে বিধানসভায় নিজের জায়গা করে নেন। আর শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে রাজভবনের শপথবাক্য পাঠ করে তিনি হয়ে উঠলেন জঙ্গলমহলের নতুন মুখ।

শনিবার দুপুরে ব্রিগেডের মঞ্চে যখন রাজ্যপাল তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করাচ্ছেন, তখন বাগডুবি গ্রাম যেন উৎসবে মেতেছে। আবির খেলা আর মিষ্টি মুখ করিয়ে গ্রামবাসীরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন। গ্রামের প্রতিটি মোড়ে এখন একটাই আলোচনা— ‘আমাদের ক্ষুদিরাম এখন মন্ত্রী’। তবে এই উচ্ছ্বাসের আড়ালে রয়েছে একরাশ প্রত্যাশা আর দাবির পাহাড়। ক্ষুদিরামের আত্মীয় ঊর্মিলা সোরেন টুডু থেকে শুরু করে প্রতিবেশী সুরাতন হেমব্রম— সকলেরই এক সুর। তাঁরা চান মন্ত্রীমশাই এবার গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটগুলো মেরামত করুন। জঙ্গলমহলের আদিবাসী গ্রামগুলোতে আজও পানীয় জলের তীব্র সংকট। নেই উন্নত মানের চিকিৎসার ব্যবস্থা। গ্রামবাসীদের আশা, পাড়ার ছেলে হিসেবে ক্ষুদিরাম মাটির অভাবগুলো জানেন, তাই বলার আগেই তিনি জঙ্গলমহলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামো উন্নয়নে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।

ক্ষুদিরাম টুডুর এই উত্তরণ কেবল বিজেপির অন্দরেই নয়, বরং বিরোধী শিবিরেও সম্মানের উদ্রেক করেছে। রানিবাঁধের দীর্ঘদিনের বাম নেত্রী তথা সিপিএমের বাঁকুড়া জেলা সম্পাদক দেবলীনা হেমব্রম তাঁর এই সাফল্যে খুশি। দেবলীনা দেবী জানান, ক্ষুদিরামের সঙ্গে তাঁর সামাজিক আত্মীয়তার সম্পর্ক। বিরোধী দলের প্রতিনিধি হয়েও তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, জঙ্গলমহলের মানুষ একজন ভূমিপুত্রকে মন্ত্রী হিসেবে পেয়ে এবার প্রকৃত উন্নয়নের স্বাদ পাবেন। এমনকি তৃণমূলের বিদায়ী মন্ত্রী জ্যোৎস্না মান্ডিও ক্ষুদিরামের সাফল্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। জ্যোৎস্না দেবী বলেন, “আমি যে বিধানসভা থেকে মন্ত্রী হয়েছিলাম, সেখান থেকেই আজ ক্ষুদিরামবাবুও মন্ত্রী হলেন। জঙ্গলমহলের উন্নয়নের প্রশ্নে তিনি বিশেষ পদক্ষেপ করবেন বলেই আমার বিশ্বাস।”

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর ছকে ক্ষুদিরাম টুডু এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আদিবাসী সমাজ থেকে উঠে আসা এই সৎ এবং সজ্জন ভাবমূর্তির নেতাকে মন্ত্রিসভায় এনে বিজেপি সরকার স্পষ্ট করে দিল যে, প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিরাই এবার রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। জঙ্গলমহলের যে মানুষগুলো একটা সময় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আর বন্দুকের লড়াইয়ে পিষ্ট হয়েছিল, ক্ষুদিরামের হাত ধরে তাঁরা এবার মূল স্রোতের উন্নয়নের স্বাদ পাবেন কিনা, এখন সেটাই দেখার। তবে আপাতত বাগডুবির ঘরে ঘরে আনন্দের দীপ জ্বলছে। কারণ, একদা রক্তের দাগ লাগা সেই প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রটিই আজ পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের কারিগরদের একজন। তাঁর কাঁধে এখন কেবল একটি গ্রাম বা একটি বিধানসভার নয়, বরং গোটা পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজের মান উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব। দিনভর ব্রিগেড আর কালীঘাটের কর্মসূচি শেষে রাতে যখন খবরের কাগজে ক্ষুদিরামের শপথের ছবি পৌঁছবে বাগডুবিতে, তখন হয়তো আরেকবার সেই ২০০৬-এর অন্ধকার রাতকে মনে করে মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। কারণ, জঙ্গলমহল আজ ধ্বংসের পথে নয়, সৃষ্টির পথে যাত্রা শুরু করেছে।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper