AB Live News
হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়: কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর স্তনের দিকে তাকিয়ে থাকা ‘ভয়্যারিজম’ নয়, তবে অনৈতিক ও অশালীন আচরণ হতে পারে
বম্বে হাইকোর্টের একক বিচারপতি অমিত বোরকর সম্প্রতি একটি উল্লেখযোগ্য রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, অফিসের মিটিংয়ে এক মহিলা সহকর্মীর স্তনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা যৌন হয়রানির অপরাধ ‘ভয়্যারিজম’ (voyeurism) হিসেবে গণ্য করা যাবে না। আদালত বলেছে, এমন আচরণ অনৈতিক, অস্বস্তিকর ও নৈতিকভাবে ভুল হতে পারে, কিন্তু তা ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪-সি ধারার আওতায় পড়ে না।
ঘটনার বিবরণ
ঘটনাটি ২০১৪-১৫ সালের। মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি বিমা সংস্থা (ম্যাক্স লাইফ ইন্স্যুরেন্স)-এর এক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী অভিজিৎ নিগুদকর (Abhijit Baswant Nigudkar)-এর বিরুদ্ধে তাঁর মহিলা সহকর্মী (ডেপুটি সেলস ম্যানেজার) অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, অভিজিৎ মিটিংয়ের সময় স্বাভাবিক চোখে চোখ রাখার পরিবর্তে বারবার তাঁর স্তনের দিকে তাকাতেন, অপমানসূচক মন্তব্য করতেন এবং তাঁকে একা মিটিংয়ে আসতে বাধ্য করতেন।
মহিলা কর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে বোরিভালি পুলিশ স্টেশনে ২০১৫ সালে FIR দায়ের হয় এবং অভিজিৎকে ধারা ৩৫৪-সি (voyeurism)-এর অধীনে অভিযুক্ত করা হয়। সংস্থার ইন্টারনাল কমপ্লেইন্টস কমিটি (ICC)ও অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে। অভিযুক্ত এই মামলাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
৮ এপ্রিল ২০২৬-এ দেওয়া রায়ে বিচারপতি অমিত বোরকর স্পষ্টভাবে বলেন,
“অভিযোগ শুধু এটুকুই যে, তিনি মিটিংয়ের সময় তাঁর স্তনের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। অবাঞ্ছিত তাকিয়ে থাকা, যদি সত্যি বলেও ধরা হয়, তা ধারা ৩৫৪-সি-র অর্থে ভয়্যারিজম নয়। আইনকে তার সরল অর্থের বাইরে টেনে নিয়ে যাওয়া যায় না।”
আদালত আরও বলে যে, ধারা ৩৫৪-সি শুধুমাত্র সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে কোনো পুরুষ কোনো নারীকে ‘প্রাইভেট অ্যাক্ট’ (যেমন—গোসল, পোশাক পরিবর্তন ইত্যাদি) করার সময় দেখেন বা ছবি তোলেন, যেখানে নারীর যুক্তিসঙ্গত প্রত্যাশা থাকে যে তাঁকে দেখা হবে না। অফিসের মিটিংয়ে সহকর্মীর শরীরের দিকে তাকানো এই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না।
বিচারপতি পর্যবেক্ষণ করেন, এ ধরনের আচরণ সর্বোচ্চ misconduct (অনিয়ম), indecency (অশালীনতা) বা নৈতিকভাবে ভুল হতে পারে। কিন্তু তা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে উন্নীত করা যাবে না। আদালত FIR এবং সমস্ত পরবর্তী ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করে দিয়েছে।
প্রিভেনশন অফ সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট অফ উইমেন অ্যাট ওয়ার্কপ্লেস অ্যাক্ট (POSH Act), ২০১৩-এর অধীনে অভ্যন্তরীণ কমিটি এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। আদালতের রায়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, সব অস্বস্তিকর আচরণকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন হয়রানি বা ভয়্যারিজম বলে চিহ্নিত করা উচিত নয়। সঠিক তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া আইনের অপব্যবহার রোধ করা জরুরি।
আইনজীবী মহলের অনেকে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এটি আইনের সীমা নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনবে এবং মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত অভিযোগ থেকে নিরপরাধ কর্মীদের রক্ষা করবে। অন্যদিকে, নারী অধিকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, বারবার অশালীনভাবে তাকিয়ে থাকা মানসিক হয়রানির কারণ হতে পারে। তাই কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণকে POSH আইনের অধীনে আলাদাভাবে বিবেচনা করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তাঁদের মক্কেল ICC-এর তদন্তেও অনেকাংশে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন। হাইকোর্টের এই রায় তাঁদের পক্ষে স্বস্তির বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রায় কর্মক্ষেত্রে নারী সুরক্ষা ও পুরুষ কর্মীদের ন্যায্য অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করবে। তবে তাঁরা এ-ও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, অফিসে শিষ্টাচার ও সম্মানজনক আচরণের নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত। কোনো আচরণ যদি বারবার অস্বস্তির সৃষ্টি করে, তাহলে সংস্থার অভ্যন্তরীণ নিয়ম অনুসারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
(তথ্যসূত্র: বম্বে হাইকোর্টের ৮ এপ্রিল ২০২৬-এর রায়, Abhijit Baswant Nigudkar বনাম মহারাষ্ট্র সরকার মামলা)
এই রায়টি কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত আইনের ব্যাখ্যায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আইনের প্রয়োগ হবে তার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে, অতিরিক্ত প্রসারিত করে নয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

