Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

জ্ঞানের বাণী শোনার কোনও দরকার আমার নেই, মমতা-অভিষেকের বিরুদ্ধেই তোপ তারকের

0 709,325,748

 সদ্য ঘটে যাওয়া রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের নজিরবিহীন বিপর্যয় ও ভরাডুবির পর এবার দলের অন্দরেই শুরু হল তীব্র অসন্তোষ ও বিদ্রোহ। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নীতি ও রণকৌশল নিয়ে এবার সরাসরি প্রকাশ্যে মুখ খুললেন কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ সদস্য তথা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম দিনের আদি সৈনিক তারক সিং। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে দলের এই শোচনীয় হারের জন্য তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভুল নীতি এবং পরিকল্পনাকেই সম্পূর্ণভাবে দায়ী করে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন। বর্ষীয়ান এই নেতার এমন মন্তব্যের জেরে এই মুহূর্তে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

গত এক সপ্তাহে দলের অন্দরে তৈরি হওয়া এই চরম বিপর্যয় নিয়ে পর্যালোচনা করতে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনে কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর ও মেয়র পারিষদ সদস্যদের নিয়ে পরপর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই দু’টি বৈঠকের একটিতেও উপস্থিত ছিলেন না বেহালার দাপুটে নেতা তারক সিং। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি কলকাতা পুরসভার অধিবেশন চলাকালীন যে নজিরবিহীন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই দিনও পুরসভার অধিবেশনে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। কেন তিনি দলের এত বড় বিপর্যয়ের পরেও এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ দলীয় কর্মসূচি ও বৈঠক এড়িয়ে চলছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সংবাদমাধ্যমের সামনে তার অত্যন্ত স্পষ্ট ও বিস্ফোরক কারণ ব্যাখ্যা করলেন এই বর্ষীয়ান নেতা।

তারক সিং অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, তিনি কোনও ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে নয়, বরং সম্পূর্ণ সচেতনভাবে ও ইচ্ছে করেই এই ধরনের ঠান্ডা ঘরে হওয়া বৈঠকগুলিতে যাচ্ছেন না। তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে বলেন, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আজ দলের নিচুতলার সাধারণ কর্মীরা এবং যুব ছেলেরা ঘরছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দক্ষিণ কলকাতার বেহালার বিভিন্ন অংশে প্রতিনিয়ত বিরোধী ও দুষ্কৃতীদের দ্বারা আক্রান্ত হতে হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের। নিচুতলার কর্মীরা যখন মার খাচ্ছেন, ঘরছাড়া হয়ে প্রাণভয়ে পালাচ্ছেন, তখন তৃণমূল নেত্রীসহ দলের প্রথম সারির উচ্চ নেতৃত্ব সেই সমস্ত আর্ত ও আক্রান্ত কর্মী-সমর্থকদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর ন্যূনতম সৌজন্যটুকু দেখাচ্ছেন না। তাঁরা মাঠ-ঘাটে কর্মীদের পাশে না দাঁড়িয়ে নিজেদের কালীঘাটের বিলাসবহুল ঠান্ডা ঘরে আটকে রেখেছেন এবং সেখানে বসে একের পর এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে চলেছেন।

দলের সাংসদদের ভূমিকা নিয়েও চরম ক্ষোভ উগরে দেন এই মেয়র পারিষদ সদস্য। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, লোকসভা এবং রাজ্যসভা মিলিয়ে এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ৪২ জন সাংসদ রয়েছেন। কিন্তু এই কঠিন পরিস্থিতিতে নিচুতলার কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর বা তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ৪২ জন সাংসদের কোনও ভূমিকা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁরা প্রত্যেকেই এখন ব্যস্ত রয়েছেন সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে মুখ দেখাতে এবং টেলিভিশনের পর্দায় বড় বড় ভাষণ দিতে। কর্মী বা সমর্থকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে তাঁদের কেউ একটিবারও এগিয়ে আসছেন না। তারক সিংয়ের সাফ কথা, যারা এই কঠিন সময়ে আমাদের সাধারণ কর্মীদের প্রোটেকশন দিতে পারছে না, যেখানে নিজেদের প্রটেকশন যদি নিজেদেরই নিজেদের উদ্যোগে নিতে হয়, তাহলে ওই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের মিটিংয়ে গিয়ে আদতে কী লাভ হবে! সেই কারণেই তিনি ওই সমস্ত বৈঠকে যাননি।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ কর্মী এবং সমর্থকদের কোনওভাবেই কোনও সুরক্ষা দিচ্ছে না বর্তমান দলীয় নেতৃত্ব। যে কারণে ওই নিঝুম ঠান্ডা ঘরে বসে শীর্ষ নেতৃত্বের মুখের অবাস্তব জ্ঞানের বাণী শোনার তাঁর কোনও সদিচ্ছা বা মানসিকতা নেই। এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দায়িত্ববোধের প্রশংসাও করেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাজ্য বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী যখন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন, তখন শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত দায়িত্বশীল আচরণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, রাজ্যের কোথায় কারা কারা ঘরছাড়া হয়ে রয়েছেন, তার একটি নির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে পুলিশ প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হোক। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, আজ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব সেই ঘরছাড়া কর্মীদের একটাও সঠিক তালিকা তৈরি করে পুলিশ বা প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে পারেনি। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী একজন দায়িত্ববোধ সম্পন্ন নেতা হিসেবে নিজের মন্তব্য ও কর্তব্য পালন করেছিলেন, কিন্তু আমাদের নিজের দল, নেত্রী এবং সামগ্রিক নেতৃত্ব শুধু ঠান্ডা ঘরে বসে একের পর এক নিষ্ফলা বৈঠক করতেই ব্যস্ত রয়েছেন। আদতে নিচুতলার কর্মীদের জন্য তাঁরা কিছুই করছেন না।

শুধু দলীয় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই নন, কলকাতা পুরসভার এই প্রবীণ মেয়র পারিষদ সদস্যের তীব্র ক্ষোভ ও কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন খোদ can কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমও। পুরসভার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারক সিং বলেন, দু’দিন আগে অধিবেশনের নামে কলকাতা পুরসভায় যা যা নাটক হয়েছে, তাতে দলের মুখ সমাজের সামনে আরও বেশি পুড়েছে। দিনের পর দিন এই দল সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত হাস্যকর হয়ে উঠছে। পুরসভার যে অধিবেশনটি নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাউন্সিলার ক্লাবরুমে করা হয়েছে, তা আইনত কখনওই গ্রাহ্য হতে পারে না। কারণ সেই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই ছিল অবৈধ। অথচ can কলকাতার মেয়র অন্তত একবারের জন্যও প্রত্যেক মেয়র পারিষদ সদস্যকে নিয়ে এই বিষয়ে জরুরি বৈঠকে বসতে পারতেন, তাঁদের মতামত নিতে পারতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তেমন কোনও পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি।

নির্বাচনে তৃণমূলের এই নজিরবিহীন পরাজয় ও পর্যদুস্ত হওয়ার পর ইতিমধ্যেই দলের ভিতরের একাংশ এবং প্রথম সারির বেশ কয়েকজন নেতা আই-প্যাক এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে আড়ালে ও প্রকাশ্যে সরব হতে শুরু করেছেন। সমস্ত দায় আই-প্যাক ও অভিষেকের ঘাড়ে চাপানোর একটা চেষ্টা চলছে। কিন্তু তারক সিং এই বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত সাহসী দাবি করেছেন। তাঁর মতে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে বর্তমানে দলের সর্বেসর্বা বা প্রধান নেতা হয়ে উঠেছেন, তার পিছনে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাই সব থেকে বেশি ছিল।

কলকাতা পুরসভার এই বর্ষীয়ান মেয়র পারিষদ সদস্য দাবি করেন, দিনের পর দিন ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের খেয়ালখুশি মতো সম্পূর্ণ দলকে চালানোর চেষ্টা করে গিয়েছেন। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলনেত্রী হওয়া সত্ত্বেও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তাঁকে কোনওদিনও আটকানোর বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ফলতার জাহাঙ্গীর খান কিংবা পুষ্পার মতো বিতর্কিত চরিত্রের যে ধরনের বাড়বাড়ন্ত ইদানীংকালে হচ্ছিল, সেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও অতিরিক্ত প্রভাবের কথা দল কিন্তু অনেক আগে থেকেই খুব ভালোভাবে জানত। এই প্রসঙ্গে তীব্র প্রশ্ন তুলে তারক সিং বলেন, এদের এত প্রভাব ও ক্ষমতা দলের ভেতর তৈরি করার পেছনে আসল হাতটা কার? কেন দিনের পর দিন এদের এই সমস্ত কুকীর্তি ও বাড়বাড়ন্ত দেখেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন? নেত্রীর এই দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রশ্রয়ের জেরেই আজ নিচুতলায় দলের এই চরম দুর্দশা ও শোচনীয় হাল হয়েছে।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper