AB Live News
ভবানীপুরের ঘরোয়া মেজাজে মোদীকে চ্যালেঞ্জ মমতার
নির্বাচনী রণকৌশল আর জনসভার চড়া সুর সরিয়ে রেখে নিজের ঘরের মাঠ ভবানীপুরে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজে ধরা দিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার বিকেলে ৭২ নম্বর ওয়ার্ডের লেডিজ পার্ক তথা উত্তম উদ্যানে আয়োজিত এক সভায় মুখ্যমন্ত্রী প্রমাণ করে দিলেন যে, ভোটারদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আত্মিক। তবে এদিনের সভার শুরুতেই এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সাক্ষী থাকল তিলোত্তমা। সভার প্রবেশপথে বড় বড় চোঙা আর মাইক দেখে মেজাজ হারান নেত্রী। উপস্থিত কাউন্সিলরদের কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এটি কোনও রাজনৈতিক পেশি প্রদর্শনের জায়গা নয়, বরং তাঁর পাড়ার মানুষের সঙ্গে এক একান্ত আলাপচারিতার আসর। নিজের বিরক্তি গোপন না করেই মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দেন, দলের কোনও কর্মী বা পুলিশ আধিকারিক যেন ভেতরে উপস্থিত না থাকেন। নেতা-পুলিশদের এক প্রকার বার করে দিয়ে ভবানীপুরের নাগরিক সমাজের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেন তিনি। সভায় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহবধূ এবং বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরা।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কেন্দ্রে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়াই করছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, কিন্তু গোটা সভায় একবারের জন্যও তাঁর নাম উচ্চারণ করেননি মমতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় প্রতিপক্ষকে গুরুত্ব না দিয়ে মমতা সরাসরি আক্রমণের তির ছুড়েছেন দিল্লির মসনদের দিকে। তাঁর লক্ষ্য যে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, তা বক্তৃতার পরতে পরতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত এক মাস ধরে রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে লাগাতার প্রচার চালানোর ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে মমতা প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, গত ১২ বছর ক্ষমতায় থেকে প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের জন্য ক’টি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছেন? প্রধানমন্ত্রীর সভাগুলোতে ভাড়া করে লোক আনার তত্ত্বকে আরও একবার উস্কে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, শহর এলাকায় সভা করা মোদীর জন্য সহজ, কারণ সেখানে লোক জড়ো করা সুবিধাজনক। পাল্টা দাবি তুলে তিনি বলেন, তৃণমূলের সভায় মানুষ আসে প্রাণের টানে, কোনও আর্থিক প্রলোভনে নয়। বিজেপির বিরুদ্ধে বিভাজনের রাজনীতির অভিযোগ এনে মমতা এদিন এনআরসি প্রসঙ্গে কড়া অবস্থান নেন। অসমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে ৯০ লক্ষ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের নিশানা করা হচ্ছে। বাংলায় এই বিভেদের রাজনীতি তিনি হতে দেবেন না বলে হুঙ্কার ছাড়েন।
সভায় উপস্থিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের সময় এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। স্থানীয়দের অভাব-অভিযোগ শোনার পাশাপাশি তাঁদের বিভিন্ন পরামর্শও ডায়েরিতে টুকে নেন মুখ্যমন্ত্রী। কেউ তাঁকে ‘ঝাঁসির রানি’র সঙ্গে তুলনা করেন, আবার কেউ তাঁকে আগামী দিনে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার স্বপ্ন প্রকাশ করেন। সভায় উপস্থিত ইসকন মন্দিরের প্রতিনিধি রাধারমণ দাস দিঘার জগন্নাথধামের সাফল্যের কথা উল্লেখ করলে মমতা স্মিত হেসে জানান, আগামী রথযাত্রার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত থাকবেন। সব মিলিয়ে রবিবাসরীয় ভবানীপুর দেখল এক লড়াকু মমতাকে, যিনি একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় বাহিনীর অপব্যবহার নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, তেমনই অন্যদিকে নিজের পাড়ার মানুষের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, দিল্লির লড়াইয়ে নামার আগে তিনি তাঁর ঘরের শক্ত ভিতের ওপর কতটা আস্থাশীল। বিজেপির বারবার টার্গেট করার বিষয়টি নিয়ে তিনি সহাস্যে বলেন, বিজেপি তাঁকে ভয় পায় কারণ তারা জানে মমতা একাই দিল্লি কাঁপানোর ক্ষমতা রাখেন। রাজপথের লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন ভবানীপুরের এই নিভৃত বৈঠক বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। সভা শেষে মাইক বা আড়ম্বর ছাড়াই মানুষের আশীর্বাদ নিয়ে যখন তিনি বেরোলেন, তখন জনসমুদ্রের গুঞ্জন একটাই—চব্বিশের এই লড়াইয়ে ঘরের মেয়েকে জেতাতে বদ্ধপরিকর তাঁর পাড়া ভবানীপুর।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

