AB Live News
“পুরী আজ দূরে নয়— সমুদ্রের ঢেউ আর ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনির মাঝে বাংলার বুকে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন শ্রীক্ষেত্র।”
পুরীর ধাঁচে এবার রথযাত্রার মহোৎসবে মেতে উঠতে চলেছে বাংলার অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র দীঘা। ওড়িশার পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের ঐতিহ্য ও গরিমাকে স্মরণে রেখে এই বছর দীঘার নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরেও মহাসমারোহে রথযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। ফলে এবার আর শুধু পুরী নয়, বাংলার আপামর জগন্নাথ ভক্ত এবং দীঘায় আসা হাজার হাজার পর্যটকও সরাসরি এই সৈকত শহরে দাঁড়িয়েই প্রভু জগন্নাথ, বলভদ্র ও দেবী সুভদ্রার রথের দড়ি টানার এক ঐতিহাসিক সুযোগ পেতে চলেছেন। রাজ্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগে এবং হিডকোর তত্ত্বাবধানে দীঘার এই সুউচ্চ মন্দিরের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার পর থেকেই এই বছরের রথযাত্রাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এবার দীঘার রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে শামিল হতে পারবেন আপামর জনসাধারণ। ভক্তদের ভাবাবেগ ও সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসন ও মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে সমস্ত রকমের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরেই দীঘার এই আন্তর্জাতিক মানের জগন্নাথ মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে রাজ্য জুড়ে কৌতূহল ছিল তুঙ্গে। ওড়িশার পুরীর মন্দিরের আদলে এবং সমপরিমাণ উচ্চতা বজায় রেখে এই মন্দিরটি গড়ে তোলা হয়েছে রাজস্থানের বিশেষ বেলেপাথর দিয়ে। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী ও ভাস্কর্য ইতিমধ্যেই পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর রথযাত্রার সময় পুরীতে যেভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে এবং ভিড়ের কারণে বহু মানুষ রথের দড়ি ছোঁয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, সেই অপূর্ণ ইচ্ছা এবার দীঘার সমুদ্র সৈকতেই পূর্ণ হতে চলেছে। মন্দির কমিটির এক প্রবীণ আধিকারিক জানান যে, দীঘার রথযাত্রাকে এক স্মরণীয় রূপ দিতে পুরীর রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই রথ নির্মাণ এবং অন্যান্য মাঙ্গলিক আচার অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শ্রীক্ষেত্রের ঐতিহ্য মেনে এখানেও তিন দেবদেবীর জন্য পৃথক ও বিশাল রথ তৈরি করা হয়েছে।
এই বছর দীঘার এই বিশেষ রথযাত্রার সূচনা পর্বে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে রাজ্যের একাধিক মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক আধিকারিক এবং দেশ-বিদেশের বহু সাধু-সন্তের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দীঘার মূল মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে রথযাত্রার নির্ধারিত পথজুড়ে কড়া নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হচ্ছে। উৎসবের দিনগুলিতে ভিড় সামাল দিতে এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কয়েক হাজার অতিরিক্ত পুলিশ কর্মী ও সিভিক ভলান্টিয়ার মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সমুদ্র সৈকতে আসা পর্যটকরা যাতে কোনও রকম সমস্যার সম্মুখীন না হন, তার জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও আনা হচ্ছে বিশেষ বদল। দীঘার সমস্ত হোটেল ও রিসোর্টগুলিতে ইতিমধ্যেই রথযাত্রার সপ্তাহের জন্য সমস্ত ঘর বুক হয়ে গিয়েছে বলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির সূত্রে জানা গিয়েছে। ওড়িশা সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও বাংলার নিজস্ব এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে আপামর মানুষ এক বিপুল আর্থিক ও সাংস্কৃতিক জোয়ারের আশা করছেন।
দীঘার এই রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং তা বাংলার পর্যটন মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পুরীর মন্দিরের সেবায়েতদের একটি প্রতিনিধি দলও ইতিপূর্বে দীঘা সফর করে এখানকার রীতিনীতি ও গর্ভগৃহের পুজো পদ্ধতি পরিদর্শন করে গিয়েছেন। রথের দিন সকালে গর্ভগৃহে বিশেষ পুজো, ছেরা পঁহরা বা রথের পথ সোনার ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করার বিশেষ নিয়ম এবং তারপর ঢাক, ঢোল, কাঁসর ও শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে তিন বিগ্রহকে রথে আরোহণ করানো হবে। এরপরই শুরু হবে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত, যখন সর্বস্তরের মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রথের দড়িতে টান দেবেন। সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া আর ভক্তদের ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে সমগ্র দীঘা উপকূল। বছরের এই বিশেষ সময়ে দীঘার রূপ যে সম্পূর্ণ বদলে যাবে এবং তা ধর্মীয় পর্যটনের এক প্রধান পীঠস্থান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। সমস্ত রকম প্রস্তুতি খতিয়ে দেখে জেলা শাসক জানিয়েছেন যে, প্রশাসনের লক্ষ্য একটাই—যাতে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃঙ্খলভাবে এই মেগা উৎসব সম্পন্ন করা যায়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

