AB Live News
‘গ্রেফতারকে ভয় পাই না’— থানায় ঢোকার আগেই হুঁশিয়ারি হুমায়ুনের
উসকানিমূলক মন্তব্য ও প্রকাশ্য জনসভা থেকে বিরোধী দলকে চরম হুঁশিয়ারি দেওয়ার অভিযোগে অবশেষে রেজিনগর থানায় হাজিরা দিলেন আমজনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) প্রধান তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। শনিবার পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সকাল সাড়ে এগারোটার কিছুটা আগেই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থানার চৌহদ্দে পৌঁছন তিনি। বিতর্কিত এই নেতার থানায় হাজিরা দেওয়াকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই রেজিনগর থানা এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা এবং পুলিশি তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। তবে থানায় প্রবেশের আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের চেনা মেজাজেই ধরা দেন বহুল চর্চিত এই রাজনীতিক। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, পুলিশি তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা থাকলেও বর্তমান রাজ্য প্রশাসনের মনোভাবের ওপর তাঁর বিন্দুমাত্র ভরসা নেই।
ঘটনার সূত্রপাত গত মাসের শেষ সপ্তাহে। মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের কাশীপুর এলাকায় আয়োজিত একটি প্রকাশ্য জনসভা থেকে রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দেওয়া একটি মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবীর। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী), তৃণমূল এবং ভারতীয় জনতা পার্টি সহ সমস্ত রাজনৈতিক দলকেই তিনি কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। বিশেষত বিজেপি নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে তিনি চরম উসকানিমূলক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, তিনি যেদিন হাজার হাজার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ময়দানে নামবেন, সেদিন এমন ‘স্যাঁটা ভাঙা মার’ শুরু হবে যে এলাকায় বিরোধীদের দলীয় পতাকা বহন করার মতো কোনও লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি জেলার বিজেপি সভাপতিও এলাকা থেকে ভ্যানিশ হয়ে যাবেন বলে তিনি প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে হুঙ্কার ছাড়েন।
হুমায়ুন কবীরের এই মন্তব্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়। সমস্ত বিরোধী দল তাঁর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং হিংসাত্মক বার্তার তীব্র বিরোধিতা করে অবিলম্বে তাঁর গ্রেফতারির দাবি জানায়। বিধানসভার অধিবেশনেও এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং এই ঘটনার কড়া নিন্দা করে বিধানসভায় স্পষ্ট জানান যে, রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর সরকারের প্রধান লক্ষ্য এবং এই ধরণের উসকানিমূলক ও লাগামহীন গণ-বক্তব্য কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। মুখ্যমন্ত্রী জানান যে, ইতিমধ্যেই হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে মুর্শিদাবাদের শক্তিপুর থানায় একটি এবং রেজিনগর থানায় দুটি মামলা রুজু করা হয়েছে। যারা তাঁকে ওই জনসভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, প্রয়োজনে প্রথমে তাদের এবং পরবর্তীতে খোদ বিধায়ককে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার সকালে পুলিশ আধিকারিকরা হুমায়ুন কবীরের বাসভবনে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির হওয়ার নোটিস দিয়ে আসেন। নোটিসে তাঁকে নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে থানায় উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল। এর আগে শক্তিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের (ওসি) কলার ধরে টেনে আনার হুমকি দেওয়ার একটি পুরোনো মামলাতেও তাঁকে তলব করা হয়েছিল, তবে সেই তলবে তিনি হাজিরা দেননি। শুক্রবার শক্তিপুর থানায় না গেলেও, শনিবার রেজিনগর থানার নোটিস মেনেই জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হাজির হন তিনি।
থানায় প্রবেশের ঠিক পাঁচ মিনিট আগে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে হুমায়ুন কবীর তাঁর স্বভাবসিদ্ধ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে রাজ্য জুড়ে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমি রাজ্য পুলিশ প্রধানকে (ডিজিপি) চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছি যে আমার নামে ঠিক কোথায় কতগুলো কেস রয়েছে। আশা করছি খুব শীঘ্রই সেই উত্তর পেয়ে যাব।’ গ্রেফতারির আশঙ্কা করছেন কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে সুর কিছুটা নরম করলেও নিজের অনমনীয় অবস্থান বজায় রেখে তিনি বলেন, ‘আমি গ্রেফতারিকে ভয় পাই না। আজ যদি পুলিশ আমাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে, তবে আমি স্পষ্ট বলে রাখছি যে শুধু আমি একা নই, আরও ১২০ জনের গ্রেফতারির তালিকা তৈরি আছে। প্রয়োজনে জেল ভরো আন্দোলন শুরু হবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে হুমায়ুন কবীর রেজিনগর ও নওদা—দুই আসন থেকেই জয়লাভ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রেজিনগর আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে উপনির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। ওই আসনে নিজের রাজনৈতিক জমি ধরে রাখতে এবং মেরুকরণের রাজনীতিকে হাতিয়ার করতেই তিনি একের পর এক এই ধরণের বিতর্কিত মন্তব্য করছেন। তবে বর্তমান সরকারের কড়া অবস্থান এবং পুলিশের এই সক্রিয়তার পর রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—আইনভঙ্গের অভিযোগে এই দাপুটে নেতার বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী ধরণের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রশাসন। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানার ভেতরে পুলিশ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে বিধায়কের ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া জারি রয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

