AB Live News
শাহী দরবারে শুভেন্দু-রথীন্দ্র,বাংলায় কি এবার ‘মহারাষ্ট্র মডেল’?
দেশের রাজধানী এখন অভূতপূর্ব এক রাজনৈতিক নাটকের সাক্ষী। দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে গত চব্বিশ ঘণ্টায় যে ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গিয়েছে, তার আঁচ এসে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাংলায় এক বিরাট রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে চলেছে, যার অভিঘাত হবে সুদূরপ্রসারী। মঙ্গলবার রাতভর দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বে একের পর এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর সেই বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসু। একই সময়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও বিধানসভার স্পিকারের এই আকস্মিক দিল্লি সফর এবং সেখানে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠককে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক উত্তাপ এখন চরমে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যে কৌশলে মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনায় বড়সড় ভাঙন ধরানো হয়েছিল এবং একনাথ শিন্ডে রাতারাতি ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিয়েছিলেন, ঠিক সেই ‘মহারাষ্ট্র মডেল’ এবার প্রয়োগ হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গে।
মঙ্গলবার রাতে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনের বাসভবনে এক অত্যন্ত গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু দুজনেই উপস্থিত ছিলেন। সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, মাঝরাতে ওই বৈঠকে আচমকাই হাজির হন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। প্রায় ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় ধরে চলে এই আলোচনা। বৈঠক শেষ হওয়ার পর গভীর রাতে নীতিন নবীনের বাড়ি থেকে শুভেন্দু অধিকারীর কনভয় বের হতে দেখা যায়। তবে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কোনও নেতাই বৈঠকের নির্যাস নিয়ে মুখ খোলেননি। বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসু অবশ্য স্বীকার করে নিয়েছেন যে, দিল্লিতে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ এবং কথাবার্তা হয়েছে। এই যৌথ উপস্থিতিই জল্পনার আগুনে ঘি ঢেলেছে। দিল্লিতে সরকার গঠনের পর সাধারণত মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টন নিয়ে চর্চা হওয়াই স্বাভাবিক এবং প্রথমে মনে করা হয়েছিল শুভেন্দু অধিকারী সেই কারণেই দিল্লি এসেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার গঠনের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে দপ্তর বণ্টন নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে এভাবে তড়িঘড়ি বৈঠক করা বিজেপির দলীয় সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে না। ফলে এই সফরের নেপথ্যে যে আরও বড় কোনও রাজনৈতিক নীল নকশা রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ফাটল ধরিয়ে বড়সড় কোনও পটপরিবর্তন ঘটানোই এই মুহূর্তের লক্ষ্য বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তবে এই কাজে বেশ কিছু আইনি ও কৌশলগত জটিলতা রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের সরাসরি দলত্যাগ করিয়ে বিজেপিতে শামিল করার ক্ষেত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইন বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাছাড়া, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে বিজেপিকে বিপুল জনসমর্থন জানিয়েছে, সেই তৃণমূলের বিধায়কদের সরাসরি পদ্মশিবিরে নিয়ে এলে জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। রাজ্য বিজেপির এক প্রথম সারির নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, বাংলার মানুষ তৃণমূল শাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই সেই দলের নেতাদের বিজেপিতে এনে পুরস্কৃত করা হলে তা জনতার কাছে অত্যন্ত ভুল বার্তা নিয়ে যাবে। এই ধরনের জটিল পরিস্থিতি এড়াতেই অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ‘মহারাষ্ট্র মডেল’ বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই মডেলে বিধায়কদের সরাসরি অন্য দলে যোগ দিতে হয় না, বরং মূল দলের অন্দরেই একটি বড় অংশকে বিদ্রোহী করে তুলে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে মূল দলটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয় অথবা সরকার ফেলার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজ্য বিধানসভার অধ্যক্ষের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। দলত্যাগ বিরোধী আইনের প্রয়োগ বা আইনি বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। সেই কারণেই শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসুর এই দিল্লি সফর এবং অমিত শাহের উপস্থিতিতে বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উপযুক্ত আইনি দিকনির্দেশ ও প্রয়োজনীয় রণকৌশল ঠিক করতেই স্পিকারকে এই প্রক্রিয়ার অংশ করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর এই গোটা রাজনৈতিক অপারেশনের নেপথ্যে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে যাঁর নাম সব চেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, তিনি হলেন চাণক্য হিসেবে পরিচিত অমিত শাহ। বিরোধী শিবিরের দুর্বল জায়গাগুলি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের ওপর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চাপ তৈরি করার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা দেশীয় রাজনীতিতে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। যদি এই জল্পনা সত্যি হয়, তবে আজকের দিনটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। বিরোধী শিবির এই তৎপরতার ওপর কড়া নজর রাখছে এবং আজ দিনভর বাংলার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

