AB Live News
নোটিস বিতর্কে অভিষেকের দিকেই বল ঠেললেন ফিরহাদ-কুণাল
আরজি কর কাণ্ডের পর থেকে শুরু করে রাজ্যের জেলায় জেলায় দলের প্রথম সারির একাধিক হেভিওয়েট নেতার আচমকা ধরপাকড় ও কেন্দ্রীয় এজেন্সির আইনি ধাক্কা তো ছিলই, কিন্তু সেই সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অস্বস্তি ও আলোড়ন তৈরি করেছে খোদ দলের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তিতে কলকাতা পুরসভার (কেএমসি) পাঠানো ডিমোলিশন বা বেআইনি অংশ ভেঙে ফেলার নোটিস। ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংস্থা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা-মায়ের নামে থাকা কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তের মোট ১৭টি নির্দিষ্ট ঠিকানায় বেআইনি নির্মাণ ভেঙে ফেলার এই সরকারি ও আইনি নোটিসকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ চোরাস্রোত এবং চরম অস্বস্তি এখন যে এক নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা দলের শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যেই দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ স্তরের নেতাদের পারস্পরিক দূরত্ব এবং উদাসীনতা রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা ঘাসফুল শিবিরের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে আবারও প্রকাশ্যে এনে ফেলেছে।
গত মঙ্গলবার এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও হাই-প্রোফাইল ইস্যু নিয়ে প্রথমবার সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলেছিলেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। সেই সময় তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে দাবি করেছিলেন যে, তিনি কেবলই একজন নীতি নির্ধারক বা ‘পলিসি মেকার’। এই নোটিস সংক্রান্ত পুরসভার দৈনন্দিন প্রশাসনিক রোজনামচার বিষয়ে তাঁর কাছে আগে থেকে কোনও খবর ছিল না বা থাকে না। আর ঠিক তার পরদিনই, অর্থাৎ বুধবার এক সাংবাদিক বৈঠক ডেকে কার্যত সেই একই রহস্যময় দূরত্বের তত্ত্ব খাড়া করলেন ববি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তি সংক্রান্ত এই চরম স্পর্শকাতর ইস্যুতে বুধবার সাংবাদিকদের একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে পড়ে মেয়র ফিরহাদ হাকিম একপ্রকার পুরোপুরি হাত ধুয়ে ফেলার স্টাইলে স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘এই পুরো ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই, আর সত্যি বলতে এটা আমার জানার কথাও নয়। পুরসভার তরফ থেকে কাকে আইনি নোটিস দেওয়া হবে বা দেওয়া হবে না, কেএমসি আইনের কোন ধারায় সেই নোটিস পাঠানো হবে—সেটার সঙ্গে বাৎসরিকভাবে কলকাতার মেয়রের সরাসরি কোনও সম্পর্ক থাকে না। এটা আমার এক্তিয়ার বা প্রশাসনিক অধিকারের মধ্যেও পড়ে না।’’ আর সরাসরি নিজের দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে ফিরহাদের এমন আলগা ও চাঁছাছোলা মন্তব্য রাজনৈতিক মহলকে স্তম্ভিত করেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘‘ওঁর ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি কোনও কথা বলতে পারব না।’’ মেয়রের এই মন্তব্য থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন যে, দলের এই চরম বিপদের দিনে পুরসভার প্রশাসনিক প্রধান হয়েও তিনি নিজের দলের শীর্ষ নেতার পাশ থেকে একপ্রকার সুকৌশলে সরে দাঁড়ালেন, যা অতীতে কখনও দেখা যেত না বা কল্পনাও করা হত না।
ফিরহাদ হাকিম যখন অত্যন্ত কৌশলে নিজেকে এই অস্বস্তিকর নোটিস-কাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে রাখছেন এবং যাবতীয় দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই এই বিষয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যময় মন্তব্য করে জল্পনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলে দিলেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক তথা দলের বর্ষীয়ান ও প্রভাবশালী মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। তিনি অবশ্য প্রথমটায় দলের চিরাচরিত অবস্থান বজায় রেখে বিরোধী শিবিরের দিকেই আক্রমণের তির শানিয়েছেন। কুণাল ঘোষের স্পষ্ট কথা, “বিজেপির নতুন সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করে এবং নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের ওপর মানসিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এটা আসলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নোংরা খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের নেতাদের হেনস্থা করাই এদের মূল লক্ষ্য।” কুণাল ঘোষের এই আগ্রাসী মন্তব্যের পরেই যখন সাংবাদিকেরা তাঁর কাছে জানতে চান যে, বিজেপির দিকে আঙুল তুললেও অভিষেকের এই ১৭টি সম্পত্তি কি সত্যিই বেআইনিভাবে তৈরি করা হয়েছে? এই নির্দিষ্ট ও সরাসরি প্রশ্নের জবাবে কুণালের সংযোজন ছিল আরও চমকপ্রদ ও ধোঁয়াশাপূর্ণ। তিনি বলেন, “বিষয়টি নিয়ে সামগ্রিকভাবে দল যা মনে করছে, দলের মুখপাত্র হিসেবে আমি সেটাই বলছি। তবে কার বাড়িতে নোটিস গেছে, ঠিক কটা নোটিস গেছে, কিংবা কলকাতায় তাঁর আসলে কটি সম্পত্তি রয়েছে—এই সমস্ত আইনি ও প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটির ব্যাপারে একমাত্র তিনি নিজেই বলতে পারবেন অথবা তাঁর নিযুক্ত আইনজীবী ভাল বলতে পারবেন, যাঁকে কেন্দ্র করে এত কথা উঠছে।” কুণালের এই সাফাইয়ের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে, তবে কি দলও এই সম্পত্তির দায় নিতে চাইছে না?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুণাল ঘোষের এই অত্যন্ত সাবধানী ও কৌশলী মন্তব্যের পর আর বুঝতে কারও বাকি নেই যে, বাইরে থেকে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে বিজেপির নতুন সরকারকে ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ’ বলে আক্রমণ করলেও, ভেতরে ভেতরে এই নোতিসের আইনি বলটি প্রকারান্তরে খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোর্টেই ঠেলে দিলেন দলের শীর্ষ নেতারা। দলের এই কঠিন সময়ে যেখানে দলের সমস্ত স্তরের নেতাদের একজোট হয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের পাশে দাঁড়ানোর কথা, সেখানে একে একে সব প্রভাবশালী নেতাই এই সম্পত্তি বিতর্ককে অভিষেকের ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ বলে দেগে দিচ্ছেন। কলকাতা পুরসভার মতো একটি স্বশাসিত সংস্থা, যা এতদিন তৃণমূলেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখান থেকে কীভাবে দলের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ডের ১৭টি সম্পত্তিতে একসঙ্গে নোটিস চলে গেল এবং তা নিয়ে মেয়র স্বয়ং কীভাবে নিজের সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করলেন, তা নিয়ে দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কুণাল এবং ফিরহাদের এই অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আইনি লড়াইয়ের ময়দানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আপাতত একাই লড়তে হবে, দলগতভাবে তাঁর এই বিপুল সম্পত্তির আইনি দায় নিতে রাজী নন হেভিওয়েট নেতারা। আগামী দিনে এই অভ্যন্তরীণ চোরাস্রোত তৃণমূলের সাংগঠনিক ঐক্যকে কোন সংকটের মুখে দাঁড় করায় এবং এই নোটিসের জবাবে অভিষেক বা তাঁর আইনি টিম কী পদক্ষেপ করেন, এখন সেটাই দেখার।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

