AB Live News
ডিউটির সময় প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধের কড়া নির্দেশ
রাজ্যে সদ্য ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি নজর ছিল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতেই এবার এক নজিরবিহীন এবং অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল নবগঠিত রাজ্য সরকার। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের একাংশের বিরুদ্ধে ডিউটির সময়েই বেসরকারি নার্সিংহোম বা নিজস্ব চেম্বারে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার যে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, তা সমূলে উৎপাটন করতে এবার কোমর বেঁধে নামল প্রশাসন। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া civilisation হয়েছে যে, সরকারি চিকিৎসকদের তাঁদের নির্দিষ্ট কর্মসময়ের পুরোটা হাসপাতালেই অতিবাহিত করতে হবে এবং ডিউটি চলাকালীন কোনওভাবেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা যাবে না। এই নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর। রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে ঢেলে সাজাতে এবং সাধারণ গরিব মানুষের চিকিৎসা পরিষেবা সুনিশ্চিত করতে সোমবার রাতে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বৈঠকে বসেন স্বাস্থ্যদপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। কলকাতার পাঁচটি প্রধান সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শীর্ষ আধিকারিকদের এই বৈঠকে তলব করা হয়েছিল।
এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ (এনআরএস), এসএসকেএম হাসপাতাল, ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ এবং আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ এবং সুপাররা। স্বাস্থ্যভবনের শীর্ষ কর্তাদের উপস্থিতিতে এই পাঁচ হাসপাতালের प्रशासनिक প্রধানদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা চলে। সূত্রের খবর, এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্যই ছিল কলকাতার এই বড় বড় hospital হাসপাতালগুলির দৈনন্দিন কাজকর্মে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা আনা এবং চিকিৎসকদের হাজিরা সুনিশ্চিত করা। সোমবার রাতের এই ম্যারাথন বৈঠকের পর মূলত পাঁচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কড়া সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা আগামী দিনে রাজ্যের স্বাস্থ্যক্ষেত্রের চেহারা বদলে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যদপ্তরের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে কলকাতার এই পাঁচটি প্রধান সরকারি মেডিক্যাল কলেজের কোন বিভাগে, কোন ডাক্তার, কখন ডিউটি করছেন, তার একটি সম্পূর্ণ এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বা ডিউটি রোস্টার প্রতি মাসের ২৫ তারিখের মধ্যে স্বাস্থ্যভবনে পাঠিয়ে দিতে হবে। চিকিৎসকদের এই আগাম এক মাসের রোস্টার জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিগত দিনে প্রায়শই এমন মারাত্মক অভিযোগ সামনে আসত যে, দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা এসে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন অথচ হাসপাতালের নির্দিষ্ট ঘরে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক অনুপস্থিত। অনেকে আবার ডিউটি চলাকালীনই হাসপাতাল চত্বর ছেড়ে নিজের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতে চলে যেতেন। এই ধরনের বেনিয়ম ও ফাঁকিবাজি রুখতেই এবার আগাম রোস্টার প্রথা চালু করা হল। স্বাস্থ্যভবন এই রোস্টারগুলি কড়া নজরদারিতে রাখবে এবং সারপ্রাইজ ভিজিট বা আকস্মিক পরিদর্শনের সময় যদি দেখা যায় যে রোস্টার অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কোনও চিকিৎসক হাসপাতালে উপস্থিত নেই, তবে তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
শুধু চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিই নয়, হাসপাতালের সামগ্রিক পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ ছিল অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একাংশের কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা। বিগত সরকারের আমলে প্রায়শই দেখা যেত যে, হাসপাতালের ট্রলি টেনে নিয়ে যাওয়ার বা রোগীদের স্ট্রেচারে করে ওয়ার্ডে পৌঁছে দেওয়ার modernisation মতো কোনও কর্মী খুঁজে পাওয়া যেত না। নিরুপায় হয়ে রোগীর অসহায় পরিবারকে নিজেদের হাতেই ট্রলি ঠেলতে হত। এই চরম অব্যবস্থা এবং হাজিরার কারচুপি রুখতে এবার কোমর বেঁধে নেমেছে বর্তমান সরকার। সোমবারের বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হাসপাতালের সমস্ত স্তরের কর্মী—তা সে বরিষ্ঠ চিকিৎসক হোন, নার্স হোন, সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা চতুর্থ শ্রেণির কর্মীই হোন না কেন, সকলের জন্যই বায়োমেট্রিক অ্যাটেনডেন্স বা আঙুলের ছাপ দিয়ে হাজিরা দেওয়া সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হল। এর ফলে কে কখন হাসপাতালে আসছেন এবং কখন ডিউটি শেষ করে বেরোচ্ছেন, তার নিখুঁত হিসেব থাকবে স্বাস্থ্যদপ্তরের কাছে। খাতায় সই করে বা প্রক্সি দিয়ে হাজিরা দেওয়ার পুরনো কারচুপি এর ফলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন আধিকারিকরা।
এর পাশাপাশি, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে এসে সাধারণ মানুষকে যাতে কোনওরকম হয়রানি বা দালালের খপ্পরে পড়তে না হয়, তা সুনিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করছে স্বাস্থ্যদপ্তর। প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের এমার্জেন্সি বা জরুরি বিভাগে এবার ২৪ ঘণ্টার জন্য হাই-ডেফিনিশন নজরদারি ক্যামেরা বা সিসিটিভি বসানো হচ্ছে। এই সিসিটিভি ক্যামেরাগুলির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চমক হল, এগুলির ওপর সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনওরকম নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। হাসপাতালের কোনও কর্মী বা আধিকারিক চাইলে এই ক্যামেরার ফুটেজ ডিলিট করতে পারবেন না কিংবা ক্যামেরার লেন্স ঘুরিয়ে রাখতে পারবেন না। এই সমস্ত ক্যামেরার সরাসরি লাইভ ফিড ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে সল্টলেকের স্বাস্থ্যভবনের সেন্ট্রাল মনিটরিং রুমে। সেখান থেকে স্বাস্থ্যদপ্তরের বিশেষ দল চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখবে যে এমার্জেন্সি বিভাগে রোগীরা ঠিকমতো পরিষেবা পাচ্ছেন কিনা, নাকি কোনওরকম ছলচাতুরি বা গাফিলতি করা হচ্ছে।
emergency জরুরি বিভাগের চিকিৎসা পরিকাঠামোতেও আনা হচ্ছে আমূল পরিবর্তন। এতদিন নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সাধারণত একজন মেডিক্যাল অফিসার এবং একজন সিনিয়র রেসিডেন্ট চিকিৎসক উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু রোগীর বিপুল চাপের তুলনায় এই পরিকাঠামো যে অত্যন্ত অপর্যাপ্ত, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তাই নয়া নিয়মে এবার থেকে প্রতিটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টার জন্যই একজন অতিরিক্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বা সহকারী অধ্যাপক পদমর্যাদার বরিষ্ঠ চিকিৎসক এবং তাঁর সঙ্গে আরও একজন চিকিৎসক মোতায়েন থাকবেন। অর্থাৎ, জরুরি বিভাগে সবসময় অভিজ্ঞ ও উচ্চপদস্থ চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হল, যাতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আসা রোগীদের দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা শুরু করা যায়। এই চিকিৎসকেরা টানা চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করার পর নিয়ম অনুযায়ী তার পরের দিন ছুটি বা অফ পাবেন, যাতে তাঁদের কাজের গুণগত মান বজায় থাকে।
government সরকারি হাসপাতালের মর্গ বা ময়নাতদন্ত কক্ষগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভাঙতেও কড়া দাওয়াই দেওয়া হয়েছে এই বৈঠকে। মৃতদেহ ময়নাতদন্ত করা বা তা পরিবারের হাতে দ্রুত তুলে দেওয়ার নাম করে মোটা টাকা লেনদেনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বহু গরিব মানুষকে স্বজন হারানোর বেদনার মধ্যেও এই চরম দুর্নীতির শিকার হতে হত। স্বাস্থ্যভবনের পক্ষ থেকে হাসপাতাল সুপার ও অধ্যক্ষদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ময়নাতদন্তের নামে কোনওরকম টাকা নেওয়ার বা দুর্নীতির অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে সরাসরি বরখাস্ত করা সহ কড়া আইনি পদক্ষেপ করা হবে। একই সঙ্গে, হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পুলিশি নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে সিভিল ড্রেস বা সাদা পোশাকে পুলিশের বিশেষ দল হাসপাতাল চত্বরের আনাচে-канаচে টহল দেবে, যাতে কোনওরকম দুষ্কৃতী বা দালাল চক্র সেখানে সক্রিয় হতে না পারে।
এর আগে এসএসকেএম হাসপাতালের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন যে, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র করতে এবং বহিরাগতদের প্রবেশ রুখতে প্রতিটি স্তরের কর্মীদের জন্য আলাদা পোশাকের বিধি ও পরিচয়পত্র চালু করা হবে। সোমবার রাতের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর সেই ঘোষণার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে চিকিৎসক, নার্স ও সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আলাদা আলাদা রঙের ও নকশার বিশেষ পরিচয়পত্র বা আইডিカード কার্ড তৈরি করা হচ্ছে, যাতে স্পষ্ট সরকারি স্ট্যাম্প থাকবে। এই নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র ছাড়া হাসপাতালের কোনও ওয়ার্ডে বা সংবেদনশীল এলাকায় কারও প্রবেশাধিকার থাকবে না। এই কার্ডের চূড়ান্ত নকশা কেমন হবে, তা নিয়েও সোমবার রাতের বৈঠকে বিশদ আলোচনা হয়েছে। সব মিলিয়ে, রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত এবং জনমুখী করে তুলতে বর্তমান সরকারের এই অল-আউট পদক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে চলেছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

