Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

হরমুজ সংকট এড়াতে ওমান থেকে সমুদ্রতলে ৪০০০ কোটির পাইপলাইন

0 69,327,904

জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ভারত এক অভাবনীয় ও উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বারবার বিঘ্নিত হওয়ায়, ভারত সরকার এখন সরাসরি ওমান থেকে গভীর সমুদ্রতলে পাইপলাইন স্থাপনের পথে হাঁটছে। প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প সফল হলে ভারতের জ্বালানি মানচিত্র চিরতরে বদলে যাবে এবং রান্নার গ্যাসের যোগানে আগামী কয়েক দশক কোনও সংকট থাকবে না।

ভারতে একটি জনপ্রিয় প্রবাদ আছে যে, ভবিষ্যতের সমাধান সংকটের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতকে সেই পথই দেখাল। ইরান ও পশ্চিমি দুনিয়ার সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী যখন কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, তখন ভারত এই বিকল্প করিডোর নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওমান থেকে সরাসরি আরব সাগরের গভীর তলদেশ দিয়ে গুজরাত উপকূল পর্যন্ত এই দীর্ঘ পাইপলাইন ভারতের জন্য এক সঞ্জীবনী সুধা হতে চলেছে।

পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, সরকার শীঘ্রই সরকারি খাতের অগ্রণী সংস্থা গ্যাস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড (GAIL), ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (EIL) এবং ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (IOC)-কে এই প্রকল্পের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত রিপোর্ট প্রস্তুত করার নির্দেশ দিতে পারে। নয়া দিল্লি-ভিত্তিক বেসরকারি কনসোর্টিয়াম সাউথ এশিয়া গ্যাস এন্টারপ্রাইজ (SAGE) ইতিমধ্যেই একটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দাখিল করেছে, যার ভিত্তিতে এই বিশাল বিনিয়োগের তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল আন্তর্জাতিক স্পট এলএনজি বাজারের ওপর ভারতের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। বর্তমানে ভারত তার প্রয়োজনের একটি বড় অংশ বিদেশের খোলা বাজার থেকে কেনে, যার দাম অত্যন্ত অস্থির। পশ্চিম এশিয়া থেকে একটি সরাসরি পাইপলাইন ভারতকে স্থিতিশীল এবং তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করবে। একই সাথে এটি কোনও নির্দিষ্ট ট্রানজিট দেশ বা সংকীর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি করবে।

প্রস্তাবিত এই মধ্যপ্রাচ্য-ভারত গভীর-জল পাইপলাইন (MEIDP) প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এটি ওমানকে সরাসরি গুজরাত উপকূলের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩১ এমএমএসসিএমডি প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের পথটি এমনভাবে নকশা করা হবে যাতে ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকাগুলো এড়িয়ে সরাসরি আরব সাগরের মধ্য দিয়ে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ওপর দিয়ে আসা যায়। এই পাইপলাইনটি ভারতকে ওমান ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরান, তুর্কমেনিস্তান এবং কাতারের মতো দেশগুলোর বিশাল গ্যাস ভাণ্ডারে সরাসরি প্রবেশের অধিকার দেবে। এই দেশগুলির সম্মিলিতভাবে প্রায় ২,৫০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে, যা ভারতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট।

কারিগরী দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম কঠিন ও গভীরতম পাইপলাইন প্রকল্প হতে চলেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৪৫০ মিটার গভীরে এই পাইপ বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, গভীর সমুদ্রে পাইপলাইন স্থাপন এবং মেরামতের কৌশলে বিশ্বব্যাপী প্রভূত উন্নতি হয়েছে, যা এই প্রকল্পকে বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। SAGE-এর দাবি অনুযায়ী, সমুদ্রতলের অবস্থা পরীক্ষার জন্য ইতিমধ্যেই প্রস্তাবিত পথে প্রায় ৩,০০০ মিটার পরীক্ষামূলক পাইপলাইন বসিয়ে সফলভাবে সমীক্ষা চালানো হয়েছে।

ভারত একটি ক্রমবর্ধমান শক্তির বাজার। বর্তমানে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার দৈনিক প্রায় ১৯০-১৯৫ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক মিটার (mmscmd)। সরকারের লক্ষ্য হল ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি মিশ্রণে গ্যাসের অংশ ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। সেক্ষেত্রে দৈনিক চাহিদা বেড়ে প্রায় ২৯০-৩০০ mmscmd হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই বিপুল চাহিদা মেটাতে সরাসরি পাইপলাইন ছাড়া গত্যন্তর নেই।

২০২৫-এর সাম্প্রতিক হরমুজ সংকট ভারতের চোখ খুলে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসার কথা ছিল। কিন্তু উত্তেজনার জেরে ইরান এই পথটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী এলএনজি সরবরাহ ২০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। যার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। এশীয় স্পট এলএনজি মূল্যের প্রধান সূচক জেকেএম, যা স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি এমএমবিটিইউতে ১০-১২ ডলারের আশেপাশে থাকত, তা সংকটের সময় লাফিয়ে ২৪-২৫ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছিল ভারতের সাধারণ মানুষের পকেটে এবং শিল্পক্ষেত্রে।

এই পাইপলাইন প্রকল্পটি সম্পন্ন হতে অনুমোদন পাওয়ার পর থেকে প্রায় পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এটি একবার চালু হয়ে গেলে ভারতের জ্বালানি সুরক্ষা এক অভেদ্য দুর্গে পরিণত হবে। হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনও সামরিক ডামাডোলের প্রভাব ভারতের রান্নার আগুনে পড়বে না। ৪০,০০০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ আদতে ভারতের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের এক দীর্ঘমেয়াদী বিমা হিসেবেই দেখছে ওয়াকিবহাল মহল। প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য সরকার এখন সমস্ত প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ছাড়পত্র সংগ্রহের ওপর জোর দিচ্ছে। ভারতের এই পদক্ষেপটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি কূটনীতির ক্ষেত্রেও এক নতুন নজির তৈরি করবে।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper