Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

চুইখিম: মেঘ, পাহাড় আর নীরবতার এক ছোট্ট গ্রাম

0 17,019,912

উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ভ্রমণের কথা উঠলেই অনেকের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে দার্জিলিং বা কালিম্পংয়ের নাম। কিন্তু কথা হল এই পরিচিত গন্তব্যগুলির বাইরেও পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে আছে এমন অনেক শান্ত, নিরিবিলি গ্রাম, যেগুলো এখনও পর্যটকের ভিড় থেকে অনেকটাই দূরে। সেই রকমই এক অপূর্ব অফবিট পাহাড়, জঙ্গল, নদী, ঝরনায় মোড়া গ্রাম হল চুইখিম। সঙ্গে তো রয়েইছে সেখানকার স্থানীয় মানুষদের মনভোলানো সংস্কৃতি। যা মুহূর্তের মধ্যেই আপনাকে তাঁদের সঙ্গে মিশে যেতে বাধ্য করবে।

কালিম্পং জেলার পাহাড়ি ঢালে অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রামটি প্রকৃতিপ্রেমী ও শান্ত পরিবেশে ছুটি কাটাতে চাওয়া ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক আদর্শ ঠিকানা। মেঘে ঢাকা পাহাড়, সবুজ বনভূমি, পাখির ডাক আর নির্জনতার মধ্যে চুইখিম যেন এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা উপহার দেয়।

কোথায় চুইখিম

চুইখিম মূলত কালিম্পং জেলার একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম। কালিম্পং থেকে প্রায় ৩০–৩৫ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত। মূলত ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের জন্য কয়েকটি বাড়ি আর হোমস্টে নিয়ে গড়ে উঠেছে। এখানকার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫০০ ফুট।

সকালবেলা চুইখিম থেকে পরিষ্কার দেখা যায় দূরের ওই হিমালয়ের বরফঢাকা শৃঙ্গ। বিশেষ করে ভোরবেলায় সূর্যের আলো যখন পাহাড়ের গায়ে পড়ে, তখন সেই দৃশ্য যেন সত্যিই অবিস্মরণীয়।

প্রকৃতির কোলে নিঃশব্দ গ্রাম

চুইখিমের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এখানকার প্রকৃতি এবং শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। শহরের ঘিঞ্জি পরিবেশ ও কোলাহল থেকে দূরে এখানে সময় যেন ধীর গতিতে চলে। আপনি সেখানকার বাসিন্দাদের লক্ষ্য করলে দেখবেন কীভাবে মিলে মিশে কাজ করছে। না আছে কোনও হিংসা, না আছে কোনও বিদ্বেষ। এমনকি তাদের জীবনে তাড়াহুড়ো করার ব্যাপারটাও হয়তো নেই। চারপাশে ঘন জঙ্গল, পাইন ও নানা পাহাড়ি গাছের সমাহার এই গ্রামটিকে সবুজে যেন মুড়ে রেখেছে।

এখানে সকাল শুরু হয় পাখির ডাক দিয়ে। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায় এই অঞ্চলে। তাই ভ্রমণপ্রিয় মানুষের পাশাপাশি পাখিপ্রেমীদের কাছেও চুইখিম একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। অনেক পর্যটক শুধু বার্ড ওয়াচিংয়ের জন্যও এখানে আসেন।

মেঘের সাথে খেলা

চুইখিমে গেলে প্রায়ই দেখা যায় মেঘ এসে পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকে। মানে এককথায় মেঘ আর পাহাড় দু’জনকে যেন আলিঙ্গন করে রেখেছে। কখনও মেঘ এসে পুরো গ্রামটাকে তার চাদর বিছিয়ে ঢেকে দেয়, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। এই মেঘ আর পাহাড়ের লুকোচুরি ভ্রমণকারীদের কাছে এক অন্যরকম আনন্দ এনে দেয়।

বর্ষাকালে চুইখিমের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। পাহাড়ি সবুজ তখন আরও ঘন হয়ে ওঠে, আর মেঘের আনাগোনা যেন আরও ঘন হয়।

স্থানীয় জীবনযাত্রা

চুইখিমের বাসিন্দারা মূলত পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের জীবনযাত্রা খুবই সহজ ও সরল। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ, পশুপালন অথবা পর্যটননির্ভর ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

এখানে পর্যটকদের থাকার জন্য বেশ কয়েকটি ছোট হোমস্টে রয়েছে। এই হোমস্টেগুলিতে অতিথিদের নিজের পরিবারের মতোই আপ্যায়ন করেন তারা। পাহাড়ি রান্নার পাশাপাশি বাড়ির রান্নার স্বাদও এখানে পাওয়া যায়।

গরম ভাত, ডাল, সবজি, ডিম বা মুরগির মাংসের ঝোল—এই সাধারণ খাবারও পাহাড়ি পরিবেশে খেতে দারুণ লাগে। অনেক সময় স্থানীয় সবজি দিয়েই রান্না করা হয় খাবার।

কাছাকাছি দর্শনীয় স্থান

চুইখিমে এসে শুধু গ্রামেই সময় কাটানোর পাশাপাশি কাছাকাছি কয়েকটি জায়গাও ঘুরে দেখা যায়। সবচেয়ে কাছেই রয়েছে ডেলো পাহাড়। এটি কালিম্পংয়ের অন্যতম জনপ্রিয় ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে চারপাশের পাহাড় ও উপত্যকার মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। যাঁরা ছবি তুলতে ভালোবাসেন তাঁরাও এই প্রকৃতির কোলে বিভিন্ন ছবি তুলতে পারবেন।

আরও একটি সুন্দর জায়গা হল ডুরপিন মঠ। শান্ত পরিবেশে অবস্থিত এই বৌদ্ধ মঠ পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। এখানে অনবরত বাজছে বুদ্ধদেবের বিভিন্ন বাণী। যা আপনার মনকে শান্ত করবে।

এছাড়াও তিস্তা নদীর ধারে গিয়ে কিছুটা সময় কাটানো যায়। নদীর ধারে বসে পাহাড়ি বাতাসে সময় কাটানো সত্যিই দারুণ অভিজ্ঞতা।

ট্রেকিং ও হাঁটার আনন্দ

চুইখিমে বড় ধরনের পর্যটন ভিড় না থাকায় এখানকার পাহাড়ি পথগুলো এখনও অনেকটাই প্রাকৃতিক অবস্থায় রয়েছে। গ্রামের আশপাশে ছোট ছোট ট্রেকিং ট্রেইল রয়েছে।

সকালে বা বিকেলে এই পথ ধরে হাঁটতে বেরোলে পাহাড়ি প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায়। পথে দেখা মিলতে পারে নানা ধরনের পাখি, প্রজাপতি বা পাহাড়ি ফুল এছাড়াও চেনা, অচেনা বহুপ্রজাতির গাছ।

কখন যাবেন

চুইখিম ভ্রমণের জন্য অক্টোবর থেকে এপ্রিল সময়টি সবচেয়ে ভালো। এই সময় আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে এবং পাহাড়ের দৃশ্যও স্পষ্ট দেখা যায়।

বর্ষাকালে এখানকার প্রকৃতি খুব সুন্দর হলেও পাহাড়ি রাস্তায় মাঝে মাঝে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। তাই অনেকেই বর্ষা বাদ দিয়ে অন্য সময়ে ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন।

কীভাবে যাবেন

চুইখিমে পৌঁছানোর জন্য প্রথমে আসতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি বা বাগডোগরা।

সেখান থেকে গাড়িতে করে কালিম্পং হয়ে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় চুইখিমে। পুরো পথটাই পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে, আর সেই পথের দৃশ্যও ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।

কেন যাবেন চুইখিমে

যাঁরা পাহাড়ে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে সময় কাটাতে চান না, বরং শান্ত পরিবেশে প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতে চান, তাঁদের জন্য চুইখিম আদর্শ গন্তব্য।

এখানে নেই বড় হোটেলের ভিড়, নেই পর্যটকদের কোলাহল। আছে শুধু পাহাড়, মেঘ, সবুজ আর নিস্তব্ধতা।

এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম যেন মনে করিয়ে দেয় ভ্রমণের আসল আনন্দ কখনও কখনও লুকিয়ে থাকে খুব সাধারণ আর নিরিবিলি জায়গাগুলির মধ্যেই।

চুইখিম তাই শুধু একটি ভ্রমণস্থান নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর এক সুন্দর সুযোগ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper