AB Live News
হাড়ের নীরব ক্ষয়!অস্টিওপোরোসিস

মানুষের শরীরের কাঠামোগত ভিত্তি হল হাড়। শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত যে হাড় আমাদের শরীরের শক্তি ও চলনক্ষমতার জোগান দেয়, সময়ের বিবর্তনে সেই হাড়ই অনেক সময় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হাড়ের এই নিঃশব্দ ক্ষয়কেই বলা হয় ‘অস্টিওপোরোসিস’। একে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বা ‘নীরব রোগ’ বলা হয়, কারণ এর কোনও প্রাথমিক উপসর্গ থাকে না, অথচ তলে তলে হাড়ের ঘনত্ব কমিয়ে এটি শরীরকে করে তোলে অত্যন্ত নরম বা ভঙ্গুর। বিশেষ করে মধ্যবয়স এবং মেনোপজ পরবর্তী সময়ে নারীদের জন্য এটি একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। সামান্য হোঁচট কিংবা প্রাত্যহিক ছোটখাটো কাজ থেকেও হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এই রোগের কারণে। বর্তমানের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা এবং পুষ্টির অভাব এই সমস্যাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা এবং সময়োপযোগী সচেতনতা হাড়ের এই ক্ষয় রোধ করতে পারে। হাড়ের সুস্থতা মানেই বার্ধক্যেও নিজের স্বাধীনতা ও সচলতা বজায় রাখা।
অস্টিওপোরোসিস হল এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি হাড়ের রোগ, যেখানে ধীরে ধীরে হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমে যায়। আমাদের হাড় দেখতে শক্ত হলেও ভেতরে ভেতরে তা জীবন্ত টিস্যু দিয়ে তৈরি, যেখানে নিয়মিত নতুন হাড় তৈরি হয় এবং পুরনো হাড় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এই দু’টির মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলেই হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। অস্টিওপোরোসিসে হাড় এতটাই ভঙ্গুর হয়ে যায় যে সামান্য আঘাত, হঠাৎ পড়ে যাওয়া বা কখনও কখনও স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজেও হাড় ভেঙে যেতে পারে। তাই একে অনেক সময় ‘নীরব রোগ’ বলা হয়—কারণ শুরুতে তেমন লক্ষণ না থাকলেও পরিণতি গুরুতর হতে পারে।
অস্টিওপোরোসিস কেন হয়, তার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে হাড় গঠনের ক্ষমতা কমে যায়, অথচ হাড় ক্ষয়ের হার বেড়ে যায়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়ায় হাড় ক্ষয় দ্রুত হয়। এই কারণে নারীদের মধ্যে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। এছাড়া দীর্ঘদিন ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-র অভাব, পর্যাপ্ত রোদে না থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন—সবই হাড় দুর্বল হওয়ার কারণ হতে পারে। কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেমন থাইরয়েডের সমস্যা, কিডনির অসুখ বা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবনও অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়। বংশগত কারণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই রোগ সাধারণত মধ্যবয়সের পর বেশি দেখা যায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত ৬৫ বছরের পর এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৫০ বছরের পর, বিশেষ করে মেনোপজের পর অস্টিওপোরোসিসের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তবে আজকাল জীবনযাপনের অনিয়ম, অপুষ্টি ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে কম বয়সেও অনেকের হাড়ের ঘনত্ব কমে যাচ্ছে। তাই এটি কেবল বার্ধক্যের রোগ নয়; বরং সচেতনতা ও সঠিক অভ্যাসের অভাবে যেকোনও বয়সেই এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অস্টিওপোরোসিস হলে কী হয়, তা প্রথম দিকে বোঝা যায় না। ধীরে ধীরে হাড়ের ভেতরের গঠন ফাঁপা ও দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফল হিসেবে হঠাৎ হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনা বাড়ে—বিশেষ করে কোমর, কবজি ও মেরুদণ্ডে। মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয়প্রাপ্ত হলে উচ্চতা কমে যাওয়া, পিঠ বেঁকে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী কোমর ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে হিপ ফ্র্যাকচার খুবই গুরুতর, কারণ এতে চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকতে হয়। এর ফলে দৈনন্দিন জীবনের স্বাধীনতা নষ্ট হয় এবং মানসিক অবসাদও বাড়তে পারে।
তবে আশার কথা হল—অস্টিওপোরোসিস অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য। এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। শৈশব ও কৈশোর থেকেই ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার যেমন দুধ, দই, ছানা, সবুজ শাকসবজি ও বাদাম নিয়মিত খেলে হাড় মজবুত হয়। ভিটামিন ডি হাড়ে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, তাই প্রতিদিন কিছুক্ষণ রোদে থাকা জরুরি। নিয়মিত ওজন বহনকারী ব্যায়াম যেমন হাঁটা, দৌড়ানো, সিঁড়ি ভাঙা বা হালকা শক্তি প্রশিক্ষণ হাড়কে শক্ত রাখে। ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ এগুলি সরাসরি হাড় ক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনে হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা (বোন ডেনসিটি টেস্ট) করানো উপকারী। যাঁদের ঝুঁকি বেশি—যেমন মেনোপজ-পরবর্তী নারী বা দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণকারী—তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট বা অন্যান্য ওষুধ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি পড়ে যাওয়া রোধ করার জন্য বাড়ির ভেতরে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ যা ধীরে ধীরে শরীরকে দুর্বল করে দেয়, কিন্তু সচেতনতা ও সঠিক অভ্যাসের মাধ্যমে একে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। হাড়ের যত্ন মানেই ভবিষ্যতের চলাফেরা ও স্বাধীনতার যত্ন। তাই ছোটবেলা থেকেই সুস্থ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যসচেতন জীবনযাপনই অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon Web Desk , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon Web Desk হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

