AB Live News
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি সুরক্ষা! সঠিক ডায়েটেই বেছে নিন সুস্থতার পথ

রিঙ্কি বিশ্বাস
(এম.এস.সি ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডায়াবেটিক এডুকেটর)
আধুনিক জীবনযাত্রায় ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ এখন খুবই সাধারণ সমস্যা হয়ে উঠেছে। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই এই দুই রোগের প্রকোপ বাড়ছে। আসলে সুস্থ থাকা অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর। চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনির ওপর তার মারাত্মক প্রভাব পড়ে। ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং নানা জটিলতা দেখা দেয়। তাই এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে সঠিক ডায়েট ও নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন ডায়েট মানে কম খাওয়া এবং ওজন কমানোর জন্য কঠোর নিয়ম মানা। আসলে ডায়েট মানে হল শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করা। যাতে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন, মিনারেল এবং ভালো ফ্যাট সবকিছুই সঠিক পরিমাণে থাকে। তাই ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও সঠিক ডায়েটের প্রয়োজন।
এই ধরনের রোগীদের শরীরে অনেক সময় মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা বা ‘ক্রেভিংস’ দেখা যায়। কিন্তু এই সময়ে অতিরিক্ত মিষ্টি বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তাই খাদ্যতালিকায় সচেতনতা বজায় রাখা জরুরি।
কার্বোহাইড্রেট নিয়ন্ত্রণ জরুরি
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা। ভাত, আলু ও চিনি—এই তিনটি খাদ্য উপাদান শরীরে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। তাই এই খাবারগুলো সীমিত বা অনেক ক্ষেত্রে বাদ দেওয়াই ভালো।
তবে এর পরিবর্তে খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে শাকসবজি, কিনুয়া, ডালিয়া ও ওটস। এগুলোতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, যা হজমে সাহায্য করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে। পাশাপাশি রক্তে শর্করার মাত্রাও হঠাৎ করে বাড়তে দেয় না। বিশেষ করে ওটস ও ডালিয়া হৃদযন্ত্রের জন্যও উপকারী বলে মনে করা হয়।
ঘরে তৈরি মিষ্টি হতে পারে বিকল্প
অনেকেই মিষ্টি খাবার খেতে খুব ভালোবাসে। আর ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও বেশি থাকে। কিন্তু বাজারের মিষ্টিতে সাধারণত অতিরিক্ত চিনি ও ফ্যাট থাকে। যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। তাই যদি মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা হয়, তবে ঘরে তৈরি কম চিনি বা স্বাস্থ্যকর উপাদানে তৈরি মিষ্টি খাওয়া ভালো। এতে শরীরের ক্ষতি কম হয় এবং মনও তৃপ্ত থাকে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য কিডনির কার্যক্ষমতা নিয়মিত পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে প্রতি তিন মাস অন্তর রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত। ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা কিডনি কতটা সঠিকভাবে কাজ করছে, তা বোঝাতে সাহায্য করে। যদি এই মাত্রা বেড়ে যায়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
দিনের শুরু হোক পুষ্টিকর খাবার দিয়ে
সকালের খাবার শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে ছাতুর শরবত বা ফল ও স্মুদি খাওয়া ভালো। ছাতু শরীরকে শক্তি দেয় এবং দীর্ঘ সময় খিদে কম অনুভূত হয়। অন্যদিকে স্মুদিতে বিভিন্ন ফল মিশিয়ে খেলে শরীর ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পায়।
দুপুরের খাবারে সুষমতা
দুপুরের খাবার হওয়া উচিত সুষম ও পুষ্টিকর। ভাতের সঙ্গে ডাল, মাছের তরকারি, সবজি ও স্যালাড রাখা যেতে পারে। ডাল শরীরকে প্রোটিন দেয়, মাছ শরীরের জন্য উপকারী ফ্যাট ও পুষ্টি সরবরাহ করে এবং সবজি শরীরকে ভিটামিন ও খনিজ দেয়। স্যালাড হজমে সহায়তা করে এবং শরীরকে সতেজ রাখে।
রাতের খাবার হোক হালকা
রাতে দেরি করে ভারী খাবার খাওয়া অনেক সময় শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই রাতের খাবার যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি খাওয়া উচিত। হালকা ও সহজপাচ্য খাবার শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং ঘুমও ভালো হয়।
বাইরে খেলে স্বাস্থ্যকর বিকল্প
অনেক সময় বাইরে খেতে হলে কী খাওয়া উচিত, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে। এই ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতীয় খাবার একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। যেমন—রাভা ইডলি বা দোসা তুলনামূলকভাবে কম তেলযুক্ত এবং হজমেও সহজ। তাই ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা বাইরে খেতে গেলে এই ধরনের খাবার বেছে নিতে পারেন।
ফল বাছাইয়ে সচেতনতা
সব ফলই যে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সমান উপকারী, তা নয়। কিছু ফল রয়েছে যেগুলো দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন—তরমুজ, বেদানা ও খেজুর বেশি খেলে অনেক সময় সুগারের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
এর পরিবর্তে আপেল বা আনারসের মতো ফল খাওয়া যেতে পারে। এগুলো তুলনামূলকভাবে কম গ্লাইসেমিক এবং শরীরের জন্য উপকারী।
আমের পুষ্টিগুণ
গ্রীষ্মকাল মানেই আমের মরশুম। আম শুধু সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এছাড়াও আমে রয়েছে পলিফেনল, যা শরীরকে বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে আম খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়তে পারে এবং ত্বকও ভালো থাকে। কিছু ক্ষেত্রে এটি ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক বলে মনে করা হয়। পাশাপাশি আম হৃদযন্ত্রকেও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
তবে যাঁদের ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেশি বা শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি থাকে, তাঁদের ক্ষেত্রে আম খাওয়া সীমিত বা অনেক সময় সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তাই এই ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে ভালো।
সুস্থ জীবনের মূলমন্ত্র
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির সমস্যা—এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অনেক বড় সমস্যাকে প্রতিরোধ করতে পারে।
সুষম খাদ্য, নিয়ন্ত্রিত কার্বোহাইড্রেট, পর্যাপ্ত শাকসবজি, নিয়মিত ফল খাওয়া এবং সময়মতো খাবার গ্রহণ এই কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চললেই সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব। পাশাপাশি নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সুস্থ শরীরই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে সুস্থ ভবিষ্যতের প্রথম পদক্ষেপ।
অনুলিখন
সুনন্দা সাহা
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

