Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

সুরলোকে সুমন, অবসান এক সোনালি অধ্যায়ের

0 509,867,524

রূপসা দাস, মুম্বই: ভারতীয় সঙ্গীতজগতে আরও একটি নক্ষত্রপতন ঘটল। সুরের মায়াজাল ছিন্ন করে চিরতরে বিদায় নিলেন কিংবদন্তি প্লেব্যাক গায়িকা সুমন কল্যাণপুর। রবিবার রাতে মুম্বইয়ের লোখন্ডওয়ালার নিজস্ব বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল উননব্বই বছর। দীর্ঘ দিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, জীবনের শেষ দিনগুলিতেও সুরের জগতেই মগ্ন ছিলেন এই প্রবীণ শিল্পী। নিজের গাওয়া পুরনো কালজয়ী গানগুলি আনমনে শুনতেন তিনি। রবিবার রাত আটটা নাগাদ সেই সুরের ঘোরে আচ্ছন্ন অবস্থাতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণের খবরে সমগ্র সঙ্গীতজগতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সোমবার বেলা সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে মুম্বইয়ের পবন হংস শ্মশানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা।

আজকের বাংলাদেশ তথা অবিভক্ত বাংলার ঢাকায় ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল সুমনের। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনিই ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে বড় সন্তান। ১৯৪৩ সালে দেশভাগের কিছু আগে মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে তৎকালীন বম্বে শহরে চলে যান। শৈশবে বা কৈশোরে তাঁর গায়িকা হওয়ার কোনও রকম সুপ্ত ইচ্ছে ছিল না। বরং ছবি আঁকা এবং সেলাইয়ের প্রতিই তাঁর প্রবল ঝোঁক ও ভালোবাসা ছিল। সেই সূত্রে তিনি বম্বের বিখ্যাত স্যার জেজে স্কুল অব আর্টসে চিত্রকলা নিয়ে পড়াশোনাও শুরু করেছিলেন। কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য অন্য এক সুরের খাতা প্রস্তুত করে রেখেছিল। একটি স্কুল তথা পারিবারিক অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন প্রখ্যাত মারাঠি সঙ্গীত পরিচালক কেশবরাও ভোলে। তিনিই সুমনের বাবার কাছে অনুরোধ করেন মেয়ের এই গায়াকী প্রতিভাকে নষ্ট না করে উপযুক্ত সঙ্গীতের তালিম দিতে। এর পর ১৯২ সালে আকাশবাণীতে প্রথম বার গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। সেই শুরু, আর তার পর সুদীর্ঘ কেরিয়ারে তাঁকে আর কখনও পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

গত শতাব্দীর ষাটের এবং সত্তরের দশকে বলিউড প্লেব্যাকে নিজের এক মজবুত ও স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন সুমন কল্যাণপুর। বিশেষ করে মহম্মদ রফির সঙ্গে তাঁর গাওয়া প্রায় একশো চল্লিশটি ডুয়েট গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন ও চিরসবুজ হয়ে রয়েছে। ‘আজকাল তেরে মেরে পেয়ার কে চর্চে’, ‘না না করতে পেয়ার তুমহি সে’ থেকে শুরু করে ‘tumne পুকারা অওর হম চলে আয়ে’—এই গানগুলি আজও আপামর সঙ্গীতপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘোরে। শঙ্কর জয়কিষণ, রোশন, মদনমোহন, শচীনদেব বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ওপি নায়ার থেকে শুরু করে নৌশাদের মতো ভারতীয় সঙ্গীতজগতের দিকপাল সঙ্গীত পরিচালকদের সঙ্গে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। হিন্দি ছাড়াও বাংলা, মরাঠি, অসমীয়া ও কন্নড় ভাষায় অজস্র সুপারহিট গান তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর গাওয়া কালজয়ী বাংলা গান ‘মনে করো আমি নেই বসন্ত এসে গিয়েছে’ বা ‘আমার স্বপ্ন দেখার দুটি নয়ন’ আজও বাঙালি শ্রোতাদের মনে এক গভীর নস্টালজিয়া ও আবেগের সৃষ্টি করে।

সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠের সঙ্গে মেলোডি কুইন লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠের এক অদ্ভুত ও অলৌকিক মিল ছিল। বহু বার সাধারণ শ্রোতারা বেতার বা রেকর্ডে তাঁর গান শুনে লতা মঙ্গেশকরের গান বলে ভুল করেছেন। কিন্তু এই তুলনাকে তিনি কখনওই নেতিবাচক ভাবে নেননি বা নিজের গায়ে মাখেননি। লতা মঙ্গেশকর ছিলেন তাঁর অত্যন্ত কাছের এবং শ্রদ্ধেয় এক বন্ধু। একসঙ্গে তাঁরা ‘চাঁদ’ ছবির জন্য গানও রেকর্ড করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে ব্যবসায়ী রামানন্দ কল্যাণপুরের সঙ্গে তাঁর পরিণীতা জীবন শুরু হয়। রক্ষণশীল পরিবার হওয়া সত্ত্বেও বিয়ের পর তাঁর সঙ্গীতচর্চায় কোনও বাধা আসেনি। তাঁদের একমাত্র কন্যা চারুলা বিয়ের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন। ২০০৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে সম্মানজনক লতা মঙ্গেশকর পুরস্কারে সম্মানিত করে। এর পর ২০২৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান পদ্মভূষণ প্রদান করে। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় মার্গ ও লঘু সঙ্গীত জগতে যে গভীর শূন্যতা তৈরি হল, তা কোনও দিন পূরণ হওয়ার নয়। তবে তিনি তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে কোটি কোটি শ্রোতার মননে থেকে যাবেন আজীবন।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper