AB Live News
যুদ্ধ থামার ইঙ্গিত দিলেন রুবিও
পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ, স্ট্রেট অব হরমুজে অস্থিরতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির উপর ঝুলে থাকা অনিশ্চয়তার আবহে আচমকাই আশার বার্তা দিল আমেরিকা। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও এমন এক মন্তব্য করলেন, যা মুহূর্তের মধ্যে কূটনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন ফেলে দেয়। তিনি জানান, “আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ববাসী ভাল কোনও খবর পেতে পারে।” তাঁর এই সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যকে ঘিরেই শুরু হয়েছে জোর জল্পনা। আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ মনে করছে, ইরান ও আমেরিকার দীর্ঘ টানাপোড়েনের অবসানের পথ খুলতে চলেছে। এমনও আশঙ্কা ছিল যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ দিকে গড়াতে পারে। কিন্তু রুবিওর মন্তব্যে আচমকাই যেন যুদ্ধের কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে আলো দেখা গেল।
দিল্লিতে ভারত-আমেরিকার উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের পর এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। কারণ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু পশ্চিম এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, তেলের বাজার, সামুদ্রিক পরিবহণ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার উপরও। বিশেষ করে স্ট্রেট অব হরমুজকে ঘিরে উদ্বেগ ক্রমশ বেড়েছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়েই হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার সরাসরি অভিঘাত পড়ে গোটা বিশ্বের উপর। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি ব্যয় এবং বাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এই পরিস্থিতিতেই রবিবার সকাল থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর। জানা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া কিছু শর্ত মেনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে নাকি সম্মত হয়েছে তেহরান। যদিও ইরানের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু ঘোষণা করা হয়নি, তবে পশ্চিমি কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘ আলোচনার পর দুই পক্ষই আপসের পথে হাঁটতে আগ্রহী হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। তার কিছু ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লিতে দাঁড়িয়ে রুবিওর “ভাল খবর” মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্ট্রেট অব হরমুজে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা। গত কয়েক মাস ধরে সেখানে বারবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন, নজরদারি বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলে বাধা এবং হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যক্ষেত্রে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বহু তেলবাহী জাহাজ বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়। ফলে পরিবহণ খরচ বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দেয়। ভারত-সহ বহু উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির উপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেই কারণে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দিল্লির বৈঠকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা হয়। মার্কো রুবিও ভারতের ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারদের মধ্যে ভারত অন্যতম। বিশ্বের দুই বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে দুই দেশের মধ্যে বহু বিষয়ে স্বাভাবিকভাবেই মিল রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে ভারত ও আমেরিকা একসঙ্গে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রুবিও আরও বলেন, প্রকৃত কৌশলগত অংশীদারিত্বের অর্থ শুধুমাত্র চুক্তি নয়, বরং অভিন্ন স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করা। তিনি স্পষ্ট করে দেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতকে পাশে পাওয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল, পশ্চিম এশিয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাংবাদিক বৈঠকে গণতন্ত্র এবং জবাবদিহির বিষয়েও মন্তব্য করেন মার্কিন বিদেশসচিব। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। বিরোধী দল থাকে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম থাকে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। কোনও সিদ্ধান্তই একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের কাছে তার ব্যাখ্যা দিতে হয়। তাঁর এই মন্তব্যকে অনেকেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
অন্যদিকে, রুবিওর মন্তব্যের পর থেকেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। অনেকের ধারণা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এমন কোনও সমঝোতা হতে পারে, যার ফলে নতুন করে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা আপাতত কমবে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, স্ট্রেট অব হরমুজে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য কোনও যৌথ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ঘোষণা হতে পারে। যদিও সরকারি ভাবে এখনও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, তবুও “ভাল খবর” শব্দবন্ধ ঘিরে প্রত্যাশা তুঙ্গে উঠেছে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সম্ভাব্য সমঝোতার গুরুত্ব অপরিসীম। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যে নতুন কোনও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে তার ভয়াবহ প্রভাব পড়ত গোটা বিশ্বের উপর। ফলে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনাকে স্বস্তির বার্তা হিসেবেই দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।
ভারতের ক্ষেত্রেও এই পরিস্থিতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভারত বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে পশ্চিম এশিয়া থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে পরিবহণ খরচ, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা— সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়। তাই পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার সম্ভাবনায় স্বস্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে বাণিজ্য মহলেও।
তবে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ সতর্কও করেছেন। তাঁদের মতে, এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। ফলে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ারও সময় আসেনি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার নজিরও কম নয়। তবুও দিল্লিতে দাঁড়িয়ে মার্কিন বিদেশসচিবের এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এখন নজর বিশ্বের— আগামী কয়েক ঘণ্টায় ঠিক কী সেই “ভাল খবর”, তা জানার অপেক্ষায় আন্তর্জাতিক মহল।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

