AB Live News
র্যাম্প থেকে রাজদণ্ড: অগ্নিমিত্রার জয়গান
গ্ল্যামার জগতের মোহময়ী আলো আর মখমলি র্যাম্প থেকে সরাসরি বাংলার ধুলোমাখা রাজনীতির ময়দান—অগ্নিমিত্রা পালের এই যাত্রাপথ কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। টলিউড থেকে বলিউড, যাঁর পোশাক পরিকল্পনায় মুগ্ধ হয়েছিলেন খোদ শ্রীদেবীর মতো কিংবদন্তি অভিনেত্রী, সেই আসানসোলের মেয়ে আজ রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতার অন্যতম অলিন্দ মহাকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। শনিবার ব্রিগেডের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন তিনি। আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে টানা দ্বিতীয়বার জয়লাভ করে নিজের রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রমাণ করা অগ্নিমিত্রা এখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্যতম প্রধান কারিগর। শিল্পাঞ্চল থেকে আসা এই ‘অগ্নিকন্যা’কে ঘিরে এখন উচ্ছ্বাসের জোয়ার দুর্গাপুর থেকে আসানসোলে।
১৯৭৪ সালের ২৫ নভেম্বর আসানসোলের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম অগ্নিমিত্রার। তাঁর বাবা প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ অশোক রায়। রাজনীতির কোনও পারিবারিক ইতিহাস না থাকলেও সমাজসেবা আর মানুষের জন্য দায়বদ্ধতার শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন বাবার থেকেই। লরেটো কনভেন্ট থেকে স্কুলজীবন শেষ করে আসানসোল গার্লস কলেজ ও বিবি কলেজ থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতক হন। এরপর ফ্যাশন ডিজাইনিং এবং এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে যান ফ্যাশন জগতে। কিন্তু মনের কোণে সবসময় সুপ্ত ছিল দেশসেবার বাসনা। রাজনীতির কঠিন লড়াইয়ে তাঁর এই উত্তরণ মোটেই মসৃণ ছিল না। গ্ল্যামার জগতের মানুষ হওয়ায় শুরুতে অনেক টিপ্পনি ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে, কিন্তু নিজের জেদ আর পরিশ্রমের জোরে তিনি সেই সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন।
শপথ নেওয়ার পর রবিবার কালীঘাট ও নকুলেশ্বর মন্দিরে পুজো দিয়ে নতুন ইনিংস শুরু করেন অগ্নিমিত্রা। সেখানে আবেগঘন গলায় তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে নামে চেনেন—একজন কর্মীর কাছে এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি এবং এগিয়ে যাওয়ার পিছনে শুভেন্দু অধিকারীর অবদানের কথা বারবার উঠে এসেছে তাঁর কথায়। সাংগঠনিক শিক্ষার জন্য দিলীপ ঘোষ, শমীক ভট্টাচার্য ও সুকান্ত মজুমদারের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অগ্নিমিত্রার কথায়, “রাজনীতির অভিজ্ঞতা ছিল না, শুধু ছিল মোদিজির সঙ্গে কাজ করার স্বপ্ন।” এবার সেই স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার পালা। তাঁর প্রধান লক্ষ্য শিল্পাঞ্চলের পুনর্জাগরণ, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং পরিকাঠামোর আমূল পরিবর্তন আনা। নারী সুরক্ষার প্রশ্নেও তিনি অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, বাংলায় মহিলাদের ওপর অত্যাচার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দিন এবার শেষ হতে চলেছে।
অগ্নিমিত্রার এই অভাবনীয় সাফল্যে দুর্গাপুরের গোপালমাঠে তাঁর পৈতৃক ভিটেয় এখন উৎসবের মেজাজ। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে জেঠু মনোরঞ্জন রায় ও জেঠিমা স্বপ্না রায় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও বাড়িতে বসেই টেলিভিশনের পর্দায় ভাইঝির জয়যাত্রা দেখেছেন। জেঠুর কথায়, “ছোট থেকেই ও খুব জেদি ছিল, আর সেই জেদই আজ ওকে বাংলার প্রথম সারির নেতৃত্বে বসিয়েছে।” পরিবারের কেউ কখনও রাজনীতির ধারকাছ দিয়ে না গেলেও অগ্নিমিত্রার অদম্য সাহস আর মানুষের জন্য কাজ করার প্রবল ইচ্ছাই তাঁকে এই শিখরে পৌঁছে দিয়েছে বলে মনে করেন তাঁর স্বজনরা। আসানসোলের সাধারণ মানুষ এখন এই আশায় বুক বাঁধছেন যে, তাঁদের ঘরের মেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব সামলে শিল্পাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘোচাবেন। একজন সফল ফ্যাশন ডিজাইনার থেকে বাংলার প্রশাসনিক ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো অগ্নিমিত্রা পালের এই কাহিনি এখন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

