AB Live News
নম্বরপ্লেট স্ক্যানেই নথির হাল, মা উড়ালপুলে কড়া নজরদারি
শিবনাথ দাস : মহানগরীর ব্যস্ততম সংযোগকারী সেতু হলেও গতি ও দুর্ঘটনার কারণে মা উড়ালপুল নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। কখনও তীব্র গতির রেষারেষি, কখনও বিপজ্জনক চিনা মাঞ্জার মারণফাঁদ, আবার কখনও বেপরোয়া যানের ধাক্কায় অকালে প্রাণহানি—সব মিলিয়ে উড়ালপুলের নিরাপত্তা বরাবরই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দুর্ঘটনার এই চেনা ছবি বদলাতে এবং শহরের যান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও নির্ভুল ও আধুনিক করতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে লালবাজার। শুধু ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য বা গতিসীমা লঙ্ঘন নয়, চলন্ত গাড়ির যাবতীয় আইনি নথিপত্রের বৈধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করতে বিশেষ ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা চালু হতে চলেছে। পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে মা উড়ালপুলেই প্রথম এই কৃত্রিম মেধার প্রযুক্তি কার্যকর করছে কলকাতা পুলিশ। এই মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় সংস্থা ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার বা এনআইসি-র সঙ্গে হাত মিলিয়েছে লালবাজার।কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হল স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ক্যামেরা। মা উড়ালপুলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে অত্যন্ত উচ্চমানের আধুনিক সেন্সরযুক্ত ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। উড়ালপুল দিয়ে তীব্র গতিতে যাতায়াতকারী প্রতিটি গাড়ির নম্বরপ্লেটের ছবি মুহূর্তের মধ্যে তুলে নেবে এই বিশেষ ক্যামেরা। নম্বরটি চিহ্নিত হওয়ামাত্রই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি সেই তথ্য সরাসরি পরিবহন দপ্তরের কেন্দ্রীয় সরকারি তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে নেবে।পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, মূলত গাড়ির দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত শংসাপত্র ও গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেটের বর্তমান স্থিতি বা মেয়াদ রিয়েল-টাইমে যাচাই করা হবে। কোনও গাড়ির সংশ্লিষ্ট নথির মেয়াদ যদি উত্তীর্ণ হয়ে থাকে, তবে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই গাড়িটিকে চিহ্নিত করবে। ট্রাফিক পুলিশের কোনও কর্মীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির মালিকের নথিভুক্ত মোবাইল নম্বরে পৌঁছে যাবে ই-চালান তথা জরিমানার অনলাইন নোটিশ। ফলে গাড়ির মালিক বুঝতেও পারবেন না কখন তাঁর ত্রুটি ধরা পড়ল।এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি চালুর ফলে পথচলতি গাড়ির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত না করেই আইনি নজরদারি চালানো সম্ভব হবে। এতদিন পর্যন্ত রাস্তায় নথিপত্র পরীক্ষার জন্য পুলিশকে হাত দেখিয়ে গাড়ি থামাতে হত। ব্যস্ত উড়ালপুলের মাঝে হঠাৎ গাড়ি থামানোর কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকত এবং পেছনের গাড়িগুলির গতি থমকে গিয়ে অকারণ যানজটের সৃষ্টি হত। নতুন পরিকাঠামোয় চলন্ত অবস্থাতেই স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিনিং সম্ভব হওয়ায় পুলিশকে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত দেখাতে হবে না। এতে চালকদের অহেতুক হেনস্থা এড়ানো যাবে, পুলিশের সময় ও শ্রম বাঁচবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকবে। মা উড়ালপুলের এই পাইলট প্রকল্পের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখার পর সাফল্য মিললে অদূর ভবিষ্যতে এজেসি বোস রোড উড়ালপুল, মা–ইএম বাইপাস কানেক্টর কিংবা বিদ্যাসাগর সেতুর মতো শহরের অন্যান্য ব্যস্ততম পথগুলিতেও এই একই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করার নীল নকশা তৈরি রাখছে ট্রাফিক বিভাগ।ডিজিটাল নজরদারির পাশাপাশি মা উড়ালপুলের দীর্ঘদিনের এক বড় সমস্যা—মাঝরাস্তায় আচমকা গাড়ি বিকল হয়ে তৈরি হওয়া তীব্র যানজট সামলাতেও বড়সড় পরিকাঠামোগত সংস্কার করা হয়েছে। উড়ালপুলের উপর মাঝেমধ্যে ছোট-বড় গাড়ি খারাপ হয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার লম্বা গাড়ির লাইন পড়ে যেত। দুর্ঘটনাগ্রস্ত বা বিকল গাড়িগুলিকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আগে গোটা উড়ালপুলে মাত্র তিনটি ‘কাট-আউট পয়েন্ট’ ছিল, যা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল অত্যন্ত কম। কলকাতা পুলিশের সুপারিশে কলকাতা পুরসভা ও সেতু পরিচালনাকারী সংস্থা সেই ‘কাট-আউট পয়েন্ট’-এর সংখ্যা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করেছে। বর্তমানে উড়ালপুলে এমন ছ’টি পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে। কোনও গাড়ি আচমকা বিকল হয়ে পড়লে উদ্ধারকারী ক্রেন বা টোয়িং ভ্যান ওই কাট-আউটগুলি দিয়ে সহজেই এসে গাড়িটিকে মূল ট্রাফিক লেন থেকে সরিয়ে সার্ভিস লেনে নিয়ে যেতে পারবে।পুলিশ কর্তাদের দাবি, একদিকে নথির ডিজিটাল যাচাই এবং অন্যদিকে বিকল গাড়ি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার এই জোড়া কৌশলে মা উড়ালপুলে ট্রাফিক আইন কার্যকর করা যেমন অনেক বেশি সুদৃঢ় হবে, তেমনই সাধারণ যাত্রীদের প্রতিদিনের সফরও হয়ে উঠবে অনেক বেশি নিরাপদ, মসৃণ ও ঝুঁকিমুক্ত।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

