Khabor Ekhon
সত্যতা যাচাই করে তবেই খবর খবরের ভেতরের খবর
Breaking News

ব্যর্থ হেল্পলাইন, আক্ষেপে তৃণমূল

0 4,908,765,401

 রাজ্যে সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে অভূতপূর্ব ক্ষমতাচ্যুতির পর হারের ময়নাতদন্তে নেমে এক চরম প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক ব্যর্থতার কথা কবুল করছেন বিদায়ী শাসক শিবিরের শীর্ষ নেতাদের একাংশ। তাঁদের স্পষ্ট আক্ষেপ, আমজনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আঁচ যদি সঠিক সময়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাত, তবে হয়তো বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র আজ অন্য রকম হত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ পনেরো বছরের শাসনকালে গ্রামীণ ও নগর জীবনে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের একাংশের দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজ, দাদাগিরি এবং সরকারি পরিষেবা না পাওয়ার বিরুদ্ধে মানুষের মনে যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমিত করার এক অনন্য হাতিয়ার ছিল ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইন। কিন্তু নবান্নের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই হেল্পলাইন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ নিরসন তো দূর অস্ত, উলটে জনবিচ্ছিন্নতা বাড়াতে অনুঘটকের কাজ করেছে। দলের একাংশের মতে, ‘দিদি’ হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিকভাবে অতীতে মানুষের ক্ষোভ যেভাবে সামাল দিতে পেরেছিলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত ভরসা করতে গিয়ে এবার তিনি তা পারলেন না। যার চূড়ান্ত মাসুল দিতে হল নির্বাচনী বৈতরণীতে।

তৃণমূলের অন্দরে এখন ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের বিপর্যয় এবং তার পরবর্তী সফল প্রত্যাবর্তনের স্মৃতি রোমন্থন করে আক্ষেপ করা হচ্ছে। সে বার লোকসভায় বড়সড় ধাক্কা খাওয়ার পর ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক-এর পেশাদার পরামর্শে চালু করা হয়েছিল ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচি। একটি নির্দিষ্ট হেল্পলাইন নম্বরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তরের সঙ্গে। সেখানে আসা প্রতিটি ফোন, প্রতিটি অভাব-অভিযোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য খতিয়ে দেখে তা সমাধানের ব্যবস্থা করতেন প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বাধীন আইপ্যাক-এর পেশাদার কর্মীরা। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে সমন্বয় সাধনের সেই সফল মডেলের সুফল মিলেছিল ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, যেখানে প্রবল হাওয়া থাকা সত্ত্বেও বিজেপিকে মাত্র ৭৭টি আসনে আটকে রেখে নজিরবিহীন জয় পেয়েছিল তৃণমূল। কিন্তু সেই সাফল্যের পর ধীরে ধীরে ‘দিদিকে বলো’র কার্যকারিতা হারিয়ে যায় এবং মানুষও তা এক সময়ে ভুলে যায়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের মে মাসে পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রাক্কালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন মোড়কে এই জনসংযোগ কর্মসূচি পুনরায় চালু করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’। ৮ জুন আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হওয়া এই নতুন প্রকল্পের রাশ কিন্তু আর কোনও পেশাদার সংস্থার হাতে ছিল না, তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছিল শীর্ষস্তরের সরকারি আমলা ও আধিকারিকদের হাতে। আর এখানেই ঘটে গিয়েছিল আসল বিপর্যয়।

অভিজ্ঞ মহলের মতে, সরকারি আধিকারিকদের হাতে এই হেল্পলাইনের দায়িত্ব দেওয়াটাই ছিল গোড়ার মস্ত বড় ভুল। ‘দিদিকে বলো’র ক্ষেত্রে যেখানে পেশাদার কর্মীরা দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করতেন, সেখানে ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ প্রকল্পের হেল্পলাইন নম্বরটি আমলাতন্ত্রের লাল ফিতের ফাসে জড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, ওই নম্বরে ফোন করলে বেশিরভাগ সময়েই ফোন বেজে যেত, কেউ তা তোলার প্রয়োজন মনে করত না। ক্বচিৎ কখনও কোনও ভাগ্যবানের ফোন সংযোগ স্থাপন হলেও মিলত কেবলই ফাঁপা সরকারি আশ্বাস, বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হত না। এর ফলে মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দুই-ই সমানতালে বাড়তে থাকে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হেল্পলাইনে ফোনের সংখ্যাও কমতে শুরু করে। নবান্নের অলিন্দে ধামাচাপা পড়ে যায় হাজার হাজার সাধারণ মানুষের আর্তনাদ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যখন তৃণমূলের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং বিজেপির আসন ১২-তে নেমে আসে, তখন বিদায়ী শাসক শিবিরের অন্দরে এক মারাত্মক আত্মতুষ্টির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। দল ধরে নিয়েছিল সব ঠিক আছে। ফলে ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইনটি আরও বেশি অবহেলা আর বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যায়। জনমানসের অবদমিত রাগের সেই চোরাস্রোত যে তলায় তলায় সুনামি তৈরি করছে, তা বুঝতেই পারেননি দলের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা।

নবান্ন সূত্রের খবর, এই হেল্পলাইনে এমন কিছু স্পর্শকাতর ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছিল, যা যদি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কানে পৌঁছাত, তবে রাজনৈতিক সমীকরণ আজ অন্য রকম হতে পারত। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরেই বেআইনি প্রোমোটিং এবং সিন্ডিকেট নিয়ে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ চরমে উঠেছিল, যা নিয়ে বহু মানুষ এই হেল্পলাইনে ফোন করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের কর্তারা সেই সব অভিযোগ ফাইলের নিচে চাপা দিয়ে রাখেন, যার পূর্ণ ফায়দা তোলেন বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী। একই রকম ঘটনা ঘটেছে জঙ্গলমহলেও। ২০২১ সালে জঙ্গলমহল থেকে নির্বাচিত এক প্রভাবশালী আদিবাসী নেতাকে মন্ত্রী করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু অভিযোগ, ওই মন্ত্রীর বিতর্কিত ক্রিয়াকলাপ এবং তাঁর এক ‘বিশেষ বন্ধু’র দাপট জঙ্গলমহলের মানুষ মোটেই ভাল চোখে দেখেননি। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইনে ফোন করে সেই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ভুরি ভুরি অভিযোগ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে থাকা আধিকারিকেরা সেই সব অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাতেই দেননি। একইভাবে দক্ষিণবঙ্গের এক প্রভাবশালী জেলা সভাধিপতির বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছিল এই হেল্পলাইনে, কিন্তু দুর্নীতির পাহাড় আড়াল করে সেই নেতাকে স্বমহিমায় পদে বহাল রাখা হয়েছিল। কোনও স্তরেই কোনও সংশোধনমূলক পদক্ষেপ না হওয়ায় সাধারণ ভোটাররা নীরবে ব্যালট বাক্সে এর প্রতিশোধ নিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে দক্ষিণবঙ্গের আলুবলয় তথা হুগলি, পূর্ব বর্ধমান এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো জেলাগুলিতে, যেখানে তৃণমূলের সাংগঠনিক দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। রাজ্য সরকারের আলু চাষ এবং বিপণন সংক্রান্ত ভুল নীতির কারণে দেউলিয়া হওয়ার পথে বসেছিলেন লক্ষ লক্ষ চাষি। নিজেদের ক্ষোভের কথা জানাতে এবং ফসলের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে কৃষকদের বড় অংশ ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইনে বারবার ফোন করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসনিক আধিকারিকদের চরম ঔদাসীন্যের কারণে সেই ফোনগুলি কোনও গুরুত্বই পায়নি। তৃণমূলের একাংশ এখন প্রকাশ্যেই আক্ষেপ করছেন যে, এই হেল্পলাইনটি যদি আমলাদের বদলে দলের নিয়ন্ত্রণে থাকত, তবে আলুবলয়ের এই তীব্র ক্ষোভের কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্তত জানতে পারতেন এবং যথাসময়ে নীতি পরিবর্তন করে কৃষকদের মন জয় করা যেত। তা হলে দক্ষিণবঙ্গের এই দুর্ভেদ্য ঘাঁটিগুলি এভাবে হাতছাড়া হত না।

প্রশাসনিক ও প্রচারের খামতি নিয়ে সরব হয়েছেন নবান্নের আধিকারিকদের একাংশও। তাঁদের দাবি, শুরুতে এই প্রকল্পে অনেক অভিযোগ আসত এবং কাজও হত। কিন্তু এই ধরণের বড় জনহিতকর কর্মসূচির যে ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজন ছিল, তা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শদাতারা করতে ব্যর্থ হন। ফলে মানুষ এক সময়ে এই হেল্পলাইনের কথা ভুলেই যান। যদিও এই নজিরবিহীন ভরাডুবির পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের প্রকল্পের ব্যর্থতা পুরোপুরি মেনে নিতে নারাজ দলের কিছু প্রবীণ নেতা। বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতে, এই কর্মসূচি ব্যর্থ হয়েছে এমন দাবি সরলীকরণ মাত্র। তাঁর দাবি, প্রত্যন্ত এলাকার বহু মানুষ এর মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন এবং কৃষিমন্ত্রী হিসেবে তিনিও এই হেল্পলাইনের পরামর্শে অনেক কাজ করেছেন। তাঁর মতে, এবারের নির্বাচন হয়েছে সম্পূর্ণ ধর্মীয় উন্মাদনার ওপর ভিত্তি করে, তাই ভোটের এই ফলাফলকে একটি কর্মসূচির ব্যর্থতা বলে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তবে শোভনদেববাবু যাই বলুন না কেন, দলের নিচুতলার কর্মী থেকে শুরু করে জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের বড় অংশই এখন মানছেন যে, আমলাতন্ত্রের ওপর অন্ধ বিশ্বাস এবং জনগণের সরাসরি ক্ষোভকে গুরুত্ব না দেওয়ার অহংকারই আজ তৃণমূলকে ক্ষমতার শীর্ষ থেকে বিরোধীাসনে টেনে নামিয়েছে।

Note :- ক্রমাগত অন্যান্য আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :- এই খবর Khabor Ekhon , দ্বারা আপডেট করা হয়েছে. এই খবরের সম্পূর্ণ দায়িত্ব Khabor Ekhon হবে। www.khaborekhon.in অথবা সম্পাদকমন্ডলীর কোন দায় থাকবে না।

PostBodyBottom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

E-Paper